প্রশাসনের অবহেলায় নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী দুবলহাটী রাজবাড়িটি ধসে পড়ছে। সোমবার রাতে দু’দফায় ধসে পড়ে রাজবাড়ির সামনের পশ্চিম দিকের একাংশ। দীর্ঘদিন অযত্ন আর অবহেলায় কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে এই পুরাকীর্তিটি।
ওই রাজবাড়িতে বসবাসকারী আলম জানান, সোমবার বিকালে ধসে পড়ে বাড়ির পশ্চিম দিকের অংশটি। এ সময় তার পালিত প্রায় ৭৬ জোড়া পায়রা প্রাসাদের ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, প্রাকৃতিক কারণে প্রাসাদটির ক্ষতি হয়নি, যা কিছু ক্ষতি হয়েছে সব করেছে মানুষ। এখন আর প্রাসাদটির দর্শনীয় কিছুই রইল না।
দীর্ঘদিন রাজবাড়িটি ছিল পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। কিন্তু, যথাযথ নজড়দারি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রাচীন এই রাজবাড়িটির পরিণতি দেখে পর্যটকরা দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। প্রসাদটি প্রায় একশ বছরের প্রাচীন। নওগাঁ শহর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী দুবলহাটি রাজবাড়ি। রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী ও তার পুত্র রাজা কৃঙ্করীনাথ রায় চৌধুরীর সময় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয় রাজ স্টেটের।
রাজপ্রাসাদের সামনে রোমান স্টাইলের বড় বড় পিলারগুলো রাজাদের রুচির পরিচয় বহন করতো। ১৮৬৪ সালে রাজ পরিবারের উদ্যোগে একটি স্কুল স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে স্কুলটির নামকরণ হয় রাজা হরনাথ উচ্চ বিদ্যালয়।
বিভিন্ন সূত্র ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, রঘুনাথ নামের এক ব্যক্তি লবন ও গুড়ের ব্যবসা করতেন। তিনি দীঘলি বিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত খয়রা নদী দিয়ে নৌকাযোগে দুবলহাটিতে ব্যবসার জন্য আসেন। তিনি প্রায় প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখতেন তাকে কে যেন বলছে, ‘তুই যেখানে নৌকা বেঁধেছিস সেখানে জলের নীচে একটি প্রতিমা আছে। সেই রাজরাজেশ্বরী দেবীর প্রতিমাটি সেখান থেকে তুলে স্থাপন কর।’ রঘুনাথ একদিন ভোরবেলা জলে নেমে দেখলেন সত্যিই সেখানে রাজরাজেশ্বরীর প্রতিমা আছে। তিনি প্রতিমাটি একটি মাটির বেদী তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করলেন এবং নিয়মিত পূজা করতেন। এরপর তার ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করলো।
রঘুনাথের বিত্ত-বৈভবের খবর জেনে যায় মোগল দরবার। মোগল দরবারের নির্দেশে তাকে ডেকে পাঠান মুর্শিদাবাদের নবাব। নবাব তাকে রাজস্ব প্রদানের হুকুম জারি করেন। তিনি নবাবকে জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেখানে শুধু জল আর জল। কোনও ফসল হয়না। তবে বড় বড় কৈ মাছ পাওয়া যায়। বিষয় বুঝতে পেরে নবাব তাকে প্রতি বছর রাজস্ব হিসাবে ২২ কাহন কৈ মাছ প্রদানের নির্দেশ দেন। এই প্রাসাদে সাড়ে ৩শ’ ঘর ছিল। ছিল ৭টি আঙ্গিনা। ছিল রাজরাজেশ্বরী মন্দির।
রাজা কৃঙ্করীনাথ রায় চৌধুরীর নাতি ও কুমার অমরেন্দ্র নাথ রায় চৌধুরীর ছেলে দুবলহাটি রাজ পরিবারের ৫৪তম পুরুষ রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধূরী (৭৬) জানান, তাদের জমিদারী ছিল সিলেট, দিনাজপুর, পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও ভারতের কিছু অংশে। হরনাথ রায় চৌধুরী রাজা খেতাব পেয়েছিলেন। এর আগের পূর্বপুরুষরা মোগলদের দেওয়া জমিদার খেতাবে ভূষিত ছিলেন। রাজা কৃঙ্করীনাথ রায় চৌধুরীর পিতা রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী অবসাদ যাপনের জন্য ‘রনবাগ’ নামে একটি বাগানবাড়ি তৈরি করেছিলেন এই রাজবাড়িতে।
ওই এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান জানান, ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, জেলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে দ্রুত রাজবাড়ির সংস্কার কাজ করা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে নওগাঁ সদর উপজেলা নিবার্হী অফিসার রবিউল ইসলাম বলেন, ঘটনা জানার পর পর দুবলহাটি রাজবাড়ি পরিদর্শন করা হয়েছে। বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরকে জানানো হয়েছে।
এব্যাপারে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের বগুড়ার আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, ওই রাজবাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরেই ওই বাড়ির মালিকানা নিয়ে হাইকোর্টের স্থিতাদেশ জারি হয়। তাই সেখানে সংস্কারের কোনও উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
/টিএন/
আরও পড়ুন:







