দেড় বছরের শিশুপুত্র ‘সাজিদ’ তার মা সাদিয়া বেগমের কোলে। জঙ্গি সম্পৃক্ততার অপরাধে আটক স্বামী ফিরোজের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়লেন সাদিয়া। মায়ের কান্না দেখে শিশুটিও কান্না শুরু করলো। মেয়ে ও নাতির কান্না দেখে নানী ফরিদা বেগমও চোখের পানি আটকাতে পারলেন না। শিশুটি জানে না, বুঝতেও পারছে না, তার বাবা ফিরোজ আহম্মেদ শেখ জঙ্গি সম্পৃক্ততার অপরাধে বুধবার ভোরে র্যাবের হাতে গাজিপুরে আটক হয়েছেন। পরিবারের মানুষেরা একসময় কিছুটা সামলে নিলেন। ততক্ষণে প্রতিবেশীরাও এসে ভিড়েছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের চক-আলোদিয়া গ্রামের সন্দেহভাজন জেএমবি জঙ্গি ফিরোজ আহমেদের শ্বশুরবাড়িতে গেলে এসব দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। প্রতিবেশীদের সামনেই ফিরোজের স্ত্রী সাদিয়া বেগম দাবি করেন, তার স্বামী ফিরোজ আহমেদ জঙ্গি নন। তিনি বলেন, ‘সে যদি জঙ্গি হতো, তাহলে আমি অবশ্যই টের পেতাম।’
সাদিয়ার পর এবার তার মা ফরিদা বেগম ও প্রতিবেশীরাও এমনটা দাবি করেন।
এর আগে চক-আলোকদিয়ার দেড় কিলোমিটার পশ্চিম বাদুল্লাপুর গ্রামে ফিরোজের গ্রামের বাড়িতে গেলে তার ভাই মাসুদ রানা এবং বড় ভাই ফরিদ আহম্মেদ শেখের স্ত্রী কামনা বেগমও ঠিক এ দাবি করেন। তবে প্রতিবেশী কলেজ শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, ফিরোজ কোনও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও তার বড় ভাই ফরিদ জামায়াতে ইসলামী করেন।
এদিকে, পরপর পৃথক ৩ ঘটনায় জামাআতুল মুজাহিদিন অব বাংলাদেশ (জেএমবি)’র দক্ষিণাঞ্চল আমির মাহমুদুল হাসান তানভীরসহ ৩ সন্দেহভাজন নারী-পুরুষ জঙ্গি ধরা পড়ায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের রশিদপুর ও বাদুল্লাপুর গ্রাম দু’টি এখন বেশ আলোচিত। ২১ জুলাই ঢাকার টঙ্গীর চেরাগ আলীতে জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়ে র্যাবের হাতে আটক হন রশিদপুর গ্রামের বাবর আলীর ছেলে মাহমুদুল হাসান তানভীর। র্যাব হাসানসহ ৫ জনকে আটক করে। তাদের নিকট থেকে বিপুল পরিমান জিহাদি বই, আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা উদ্ধার করে র্যাব। যশোহর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে হাসান, এমন তথ্য জানায় তখন র্যাব ও পুলিশ।
অপরদিকে, জঙ্গি তৎপরতার দায়ে উল্লাপাড়ার রশিদপুরের পাশ্ববর্তী বাদুল্লাপুর গ্রামের ফুড অফিসের সাবেক কর্মচারী মৃত সুজাবত আলীর মেয়ে নাদিরা তাবাসুম রানী (৩০) ডিবি পুলিশের হাতে আটক হন। ২৪ জুলাই সিরাজগঞ্জ জেলা শহরের মাছিমপুর মহল্লায় হুকুম আলীর ভাড়ার বাড়ি থেকে ৩ সন্দেহভাজন জেএমবি জঙ্গি নারীর সঙ্গে আটক হয় সে। ওই সময় র্যাব তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ উগ্র মতবাদের জিহাদি বই ও বোমা তৈরির সারঞ্জম উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ।
এছাড়া, গত ২৪ আগস্ট ভোরে গাজীপুর জেলার হাজিরপুকুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি স্টেশনারী-লাইব্রেরি দোকানে অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় বাদুল্লাপুর গ্রামের সাইদুর রহমান শেখের ছেলে সন্দেহভাজন জেএমবি সদস্য ফিরোজ আহম্মেদ শেখ (২২)। জেএমবির নারী প্রশিক্ষক ও ফিরোজসহ এ সময় র্যাবের হাতে আটক হন ৫ জন।
পরপর ৩টি ঘটনায় জেলার উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের ওই দু’টি গ্রামের ৩ অধিবাসী জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে টঙ্গী, সিরাজগঞ্জ ও গাজিপুরে আটক হবার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকেরই নজর এখন এ দু’গ্রামে। তাদের আশঙ্কা এ দু’টি গ্রামের অনেকেই জেএমবির সঙ্গে জড়িত। সারা দেশে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও এলাকাবাসী মুখ খুলছে না।
এদিকে, র্যাবের হাতে আটক জেএমবির দক্ষিণাঞ্চল আমির মাহমুদুল হাসান যশোহর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় বেশ ক’বার তার জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গীদের নিয়ে রশিদপুর গ্রামে বিচরণ করছেন। হাসানের বড় ভাই হামিদ ও বাবা বাবর আলীও দীর্ঘদিন থেকে পলাতক রয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) ওই গ্রামে গিয়ে তাদের কোনও হদিস মেলেনি।
অপরদিকে, নাদিরা তাবাসুম রানীর গত ৬ বছর আগে বিয়ে হয় গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পার্বতীপুর গ্রামের মাহবুব হোসেনের সঙ্গে। বিয়ের পর রানী স্বামীর প্ররোচনায় জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েন বলে তিনি রিমান্ডে ডিবি পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। মাহবুব রানীকে বিয়ে করার পর তাকে কিছুদিন শ্বশুরবাড়িতে পরবর্তীতে ঢাকায় এবং আটক হবার বেশ কিছুদিন আগে সিরাজগঞ্জ জেলা শহরের মাছিমপুরে ভাড়ার বাড়িতে অন্যান্য ৩ নারী জঙ্গির সঙ্গে রাখেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন আশঙ্কা রয়েছে যে, সিরাজগঞ্জ শহরে রানী থাকা অবস্থায় তার স্বামী মাহবুব বাদুল্লাপুর গ্রামের বেশ ক’জনকে জিহাদের কথা বলে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে দলভুক্ত করেছে।
সিরাজগঞ্জ ডিবি পুলিশের ওসি মো. ওয়াহেদুজ্জামান বলেন, গত দেড় মাসে পর পর ৩টি ঘটনায় বাদুল্লাপুর ও পাশ্ববর্তী রশিদপুর গ্রামের ৩ জেএমবি টঙ্গী, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জে আটক হবার পর ধারণা করা হচ্ছে, এ দু’গ্রামের আরো অনেক অধিবাসী দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেএমবির কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। গ্রামের লোকজন কোনভাবেই তাদের বিষয়ে মুখ খুলছে না।
/এইচকে/
পড়ুন: জঙ্গিদের ডিএনএ পরীক্ষা থেকে যা জানতে পারবে পুলিশ







