যে কারণে রাবিতে নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ করলো আ. লীগ

রাবি প্রতিনিধি
২৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১:২৭আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১:৩৩

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন সময় নগর আওয়ামী লীগ নেতাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলীয় নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের প্রশাসনের সন্তোষ প্রকাশ করলেও, বর্তমান প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ ও প্রকাশ্যে হুমকি-ধামকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭টি পদের নিয়োগে অস্বচ্ছতার অভিযোগ এনে পরীক্ষা বন্ধ করে দেয় দলটির নেতাকর্মীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন ও উপ-উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় দলীয় প্রার্থীদের নিয়োগ না দেওয়ায় বিভিন্নভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সভায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুজ্জামান লিটন উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি-আপনার যোগ্যতায় ভিসি-প্রোভিসি হননি, আওয়ামী লীগ করেন বলেই আপনি ভিসি-প্রোভিসি হয়েছেন, এ কথাটি ভুলে যাবেন না।’

এসময় দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ প্রদান প্রসঙ্গে লিটন বলেন, ‘রাবি প্রশাসন বলতে যে দুইজনকে বোঝায়, তারা আমাদের খুব কাছের মানুষ। কিন্তু কাছের মানুষ থেকে লাভ কী, যদি দলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করেন? বিএনপি যদি একবারে কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে ৫৪৪ জনকে নিয়োগ দিতে পারে, আপনারা কি ১৪৪ জনকে দিতে পারেন না? বর্তমানে প্রায় ৫০০ পদ শূন্য আছে। স্বাধীনতার পক্ষের দেড়’-দুইশ ছেলেকে কি চাকরি দেওয়া যায় না?’

এর আগে ২০১৩ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগ শাখার উপ-দফতর সম্পাদক থাকা অবস্থায় ডাবলু সরকার উপাচার্য দফতরে এসে বলেন, দল ক্ষমতায় থাকতে চাকরিপ্রত্যাশী নেতাকর্মীরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না পান এবং এর জেরে তারা যদি ভাঙচুর করেন, তাহলে তার দায়ভার তিনি নেবেন না।

এরপর ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিনের দফতরে উপস্থিত হয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার উপাচার্যকে দলীয় প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে চাপ দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর আগের দিন ১৫ এপ্রিল আরেক নেতা গোদাগাড়ি-তানোর আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুকও উপাচার্য দফতরে এসে টেবিল চাপড়ে হুমকি দিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।  

এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রকাশ্যে বর্তমান প্রশাসনের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের। যা একটি স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু পরিবেশের ক্ষেত্রে বাধা বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট অনেকেই। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাও।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত উপাচার্য আব্দুস সোবহানের আমলে বিজ্ঞাপিত প্রায় ২০০ পদের বাইরে শিক্ষক পদে অতিরিক্ত অন্তত দেড় শতাধিক জনকে অস্থায়ী ও অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিকাংশ দলীয়করণের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিলে সৃষ্ট হয় মহানগর আওয়ামী লীগের সঙ্গে দূরত্ব। এর একমাত্র কারণ নিয়োগে দলীয় প্রার্থীদের প্রাধ্যন্য না দেওয়া।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে সাড়ে ৮টায় নিয়োগে বয়সসীমা বাতিল ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাটালগার পদে নিয়োগ পরীক্ষার হলে ঢুকে পরীক্ষার্থীদের তুলে দিয়ে দিয়ে কেন্দ্রে তালা ঝুলিয়ে দেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এরপর তারা কেন্দ্রের ফটকগুলোয় তালা ঝুলিয়ে দেয়। অন্যদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গেটে অবস্থান নিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেয়। এসময় তাদের প্রবেশপত্র কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয় ও অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে নেতাকর্মীরা তাদের বক্তব্যে দলীয় প্রার্থীদের নিয়োগ ও স্থানীয়দের প্রাধান্য না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এরপর পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে ঢুকতে না পারায় ১০ থেকে ১১টা পর্যন্ত ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ক্যাটাগরির নিয়োগ পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়নি। এছাড়া ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় শিক্ষকদেরও লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ক্যাটাগরিতে ২৭টি পদের বিপরীতে গত ২৩ অক্টোবর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত তিনজন ক্যাটালগার পদে, ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ২০ জন ড্যাটা এন্ট্রি অপারেটর এবং বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ৪ জন গ্রন্থাগার সহকারী পদের পরীক্ষা হওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল। তিনটি ক্যাটাগরিতে মোট ২৭টি পদের বিপরীতে আবেদন করেন ৩ হাজার ২২০ জন পরীক্ষার্থী। এতে প্রার্থীদের বয়সসীমা ১৮ থেকে ৩০ এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারিত ছিল। এই বয়সসীমা উঠিয়ে দিয়ে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানান নেতাকর্মীরা।

‘স্বেচ্ছাচারিতার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে’ অবরোধ

অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘চাকরি কে পাবে তা নিয়ে আমাদের মাথা ব্যাথা নেই। তবে অস্বচ্ছতা দূর করে চাকরির নির্ধারিত বয়সসীমা উঠিয়ে দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আমরা অবস্থান নিয়েছি।’ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও এমনকি এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারিত কোনও বয়সসীমা ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বারবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।

এদিকে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ সিদ্ধান্তে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে প্রধান গেটসহ অন্যান্য গেট খুলে দেয়।

এ ব্যাপারে জানতে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নিয়ম মেনে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত করেছিলাম। সে অনুযায়ী আমরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, কিন্তু বহিরাগতরা এসে বিশৃঙ্খলা করে পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে। দাবি বা অভিযোগ আমাদের লিখিতভাবে না জানিয়ে এভাবে পরীক্ষা বন্ধ করা দুঃখজনক।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে আপাতত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে আলোচনা করে পরীক্ষার পরবর্তী সময় জানানো হবে।’

এ বিষয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে বয়সসীমাসহ যোগ্যতায় কিছু পরিবর্তন এনেছে। যা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এটা করার পর থেকেই চাকরিপ্রত্যাশীসহ অনেকে এর বিরোধিতা করেছেন। এরপরও তারা তাদের পরিবর্তিত যোগ্যতা অনুযায়ী পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে। এ কারণে চাকরিপ্রত্যাশী ও বিশ্ববিদ্যালয়লগ্ন এলাকাবাসী পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে এবং  আগামীকালের পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হবে না। তাদের মধ্যে আমাদের কয়েকজন কর্মীও থাকতে পারেন। তবে, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বয়স এবং যোগ্যতার বিষয়টি আবারও পুনর্বিবেচনার কথা বলেছে এবং এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের সমঝোতাও হয়েছে।

প্রসঙ্গত, এ নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ করতে বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও আইসিটি সেন্টারের প্রশাসককে হুমকি দেওয়া হয়। এর আগে গত ২১ ডিসেম্বর রাবি স্কুলের একটি নিয়োগ পরীক্ষার সাক্ষাৎকার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।

/ইএইচএস/এইচকে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম