বিষমুক্ত, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত আম উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনসহ রাসায়নিক দিয়ে আম পাকানো বন্ধে এবারও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রশাসন। আগে ভাগে অপুষ্ট আম পেড়ে নেওয়া হলে তাতে রাসায়নিক মিশিয়ে দ্রুত পাকানোর আশঙ্কা রয়েছে। সেই আশঙ্কা থেকেই আম পাড়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে প্রশাসন। আগামী ২৫ মে’র আগে আম পাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলাব্যাপী আমের জাত ভিত্তিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে আম বাজারজাতকরণের আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন আম ব্যবসায়ীরা। আড়তের ঘর মেরামত, ডালিসহ উপকরণ মজুদ করা শুরু করেছেন তারা।
আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানগুলোতে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে নানা জাতের আম। নিয়ম অনুযায়ী পাকা আম বাজারে আসতে এখনও সপ্তাহ তিনেক বাকি। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি লাভের আশায় কৃত্রিমভাবে রং বদলে দিয়ে অপুষ্ট আমকে পাকা বলে বিক্রি করেন বাজারে। মূলত এ কারনেই প্রশাসন ভোক্তাদের কথা চিন্তা করে ২৫ মে’র আগে বাগানের আম পাড়া বন্ধ রাখার নির্দেশনা জারি করেছে। বৃহস্পতিবার (৪ মে) এই নির্দেশ জারি হয়েছে।
আমের জাত উল্লেখ করে পাড়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। গোপালভোগ ২৫ মে, হিমসাগর/ ক্ষিরসাপাত ২৮ মে, লক্ষণভোগ/লখনা ১ জুন, ল্যাংড়া ও বোম্বাই খিরসা ৫ জুন, ফজলি, সুরমা ফজলি ও আম্রপালি ১৫ জুন, আশ্বিনা ১ জুলাই থেকেই পাড়ার নির্দেশনা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। নির্দেশ না মানা আম চাষিদের ব্যাপারে কঠোর হওয়ার কথাও বলেছে প্রশাসন।
এদিকে, প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়সীমাকে স্বাগত জানিয়েছেন আম চাষিরা। শিবগঞ্জের ছত্রাজিতপুরের আমচাষী সাজেদুল হক ও কানসাটের আমবাগান মালিক জহিুরুল ইসলাম জানান, আবহাওয়াগত কারণে কোনও বছর আম দশদিন আগেই পাকে; আবার কোনও বছর দশদিন পরে। তবে চলতি মৌসুমে আবহাওয়া গতবারের চেয়ে অনুকূলে রয়েছে। বৃষ্টিপাতও বেশি হয়েছে। তাই এবার গতবারের মতো আগেই আম পেকে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম।
বাজার আনার প্রস্তুতি শুরু
ইতোমধ্যেই আম বাজারজাতকরণের প্রস্তুতি শুরু করেছেন আমচাষি, বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরা। ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চুটু জানান, ‘এ বছর ইতোমধ্যে আমচাষি এবং ব্যবসায়ীরা আম বাজারজাতকরণের প্রস্তুতি হিসেবে আড়তের ঘর মেরামত, ডালিসহ উপকরণ মজুদ করা শুরু করেছেন।’
জেলার সবচেয় বড় আমের বাজার কানসাট আম আড়ৎদার সমিতির সভাপতি হাবিবুর রহমান জানান, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানের আমের ব্যাপারীরা আগের বকেয়া পরিশোধ করেছে। জেলার কানসাট, শিবগঞ্জ, ভোলাহাটের আম ফাউন্ডেশন, রহনপুর, মল্লিকপুর, সদরঘাট আমবাজারের আড়তগুলোতে ব্যাপারীদের আগমন ঘটতে শুরু করেছে। ২৫ মে থেকে আগামজাতের গোপালভোগসহ গুটি আম দেশের বিভন্ন স্থানে পাঠানোর জন্য অর্ডার শুরু হয়েছে।’
অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যাংক, কুরিয়ার সার্ভিস, আবাসিক ও খাবার হোটেল মালিকরা আম ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে তাদের সেবা দেওয়ার জন্য বড় বড় আমবাজার এবং আড়তে যোগাযোগ শুরু করেছে। এসময় জেলার অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি প্রায় দেড় লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বেঁধে দেওয়া সময়সীমা সর্ম্পকে বিশেজ্ঞদের মত
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মঞ্জুরুল হুদা জানান, চলতি বছর জেলার পাঁচ উপজেলায় ২৬ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ বছর বেঁধে দেওয়া নতুন এই সময়ীমায় আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা লাভবান যেমন হবেন, তেমনি ভোক্তারা পাবেন পরিপক্ক ও সুস্বাদু আম।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর জেলার প্রায় প্রতিটি আমবাগানে প্রচুর মুকুল ও গুটি আসে। কিন্তু এপ্রিল মাসে অব্যাহত তাপদাহে প্রচুর গুটি ঝরে পড়ে। সবশেষ শিলাবৃষ্টি এবং কালবৈশাখী ঝড়ে ১০ শতাংশ আমের ক্ষতি হয়।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন, প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়সূচিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ আম উৎপাদন হয়েছে তাতে এবার চাষিরা ভালো দাম পাবেন এবং লাভবান হবেন। পাশাপাশি আমচাষিরা গত বছর ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আমের দাম ভালো পাওয়ায় এবার প্রায় দেড় কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’
তিনি জানান, এই ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির প্রায় ৬৬৫ মেট্রিক টন আম গতবছর ইউরোপের দেশগুলোতে রফতানি করা হয়েছে। এবার গতবারের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আম বিদেশে রফতানি করা সম্ভভ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কঠোর অবস্থানে প্রশাসন
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিসি মো. মাহমুদুল হাসান জানান, জেলার আমের ঐতিহ্য ও সম্মান ধরে রাখার জন্য অপরিপক্ব আম পেড়ে যাতে কেউ কেমিক্যাল দিয়ে পাকাতে না পারে, সেজন্য সবার মতামতের ভিত্তিতে এবার বছরব্যাপী আম পাড়া ও বাজারজাতকরণে এই সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। এসময়ের আগে কেউ আম পেড়ে বাজারজাত করলে মনিটরিং কমিটি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া, মৌসুমে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, পিজিআর, ফরমালিন, ইভাফনের মাধ্যমে আম পাকানো বন্ধকরণে হাট-বাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে উদ্বুদ্ধকরণসভা, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় থাকবে।
তিনি আরও জানান, গত বছরের চেয়ে এবার সময় এগিয়ে নেওয়ায় আমচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভোক্তাদের বিষমুক্ত আম খাবারের লক্ষে এ সিদ্ধান্ত অনেকেই মেনে নেবেন বলেই মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, জেলার সব উপজেলার আম বাজারে বিএসটিআই, র্যা ব, পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রতিদিন অভিযান চালাবে।
এদিকে কানসাট আম বাজারের মহাসড়কে যানজটমুক্ত করতে সব আম ব্যবসায়ীদের মহাসড়ক মুক্ত রেখে রাস্তার দুই পাশে আম বোঝাই ভ্যান দাঁড় করানোর পরামর্শ দেন জেলা প্রশাসক।
জেলা ব্যান্ডিং
২০১৮ সালের মধ্যে শতভাগ আম প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘সোর্স অফ অরিজিন’ নিশ্চিতকরণ ও আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ‘জেলা ব্যান্ডিং’ এর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই সময়সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন প্রশাসন। এ বিষয়ে জেলায় বিষমুক্ত আম উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের ওপর একটি কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে প্রশাসন। এছাড়া আম শ্রমিকদের তালিকা করে আম মৌসুম পরবর্তী সময়ে বেকারত্ব দূরীকরণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
ভারতীয় আম আমদানি না করার দাবি সংগঠনগুলোর
এ বছর এপ্রিল মাসে প্রচণ্ড তাপদাহে আমের গুটি ঝরে পড়ায় ও কালবৈশাখীতে আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় ভারতীয় আম আমদানি না করার দাবি জানিয়েছেন জেলার আম সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। তারা বলছেন, এ বছর আম নষ্ট হওয়ায়, চাহিদার সুযোগ নিতে পারে কিছু ব্যবসায়ী। এতে ভারতীয় আম দেশের বাজারে প্রবেশ করলে আবারও লোকসানের মুখে পড়বে তারা।
ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চুটু ও কানসাট আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক জানান, তাপদাহে আমের গুটি ঝরে পড়া ও কালবৈশাখীতে আমের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ভারতীয় আমের আমদানি হতে পারে। তাই সরকারের কাছে গত দুই বছরে আম ব্যবসায়ীদের ক্ষতির দিক বিবেচনা করে এবার ভারত থেকে আম আমদানি বন্ধ রাখার দাবি জানান তারা।
/এফএস/আপ-এআর/








