রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল মঙ্গলবার (০৮ মে)। হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটভুক্ত পাঁচ আসামির রায় ঘোষণা করবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। তবে হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পার হলেও ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ শরিফুল ইসলামকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এন্তাজুল হক বাবু বলেন, ‘সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শিরীন কবিতা আখতার মঙ্গলবার রায় ঘোষণার দিন ঠিক করেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জীবিত ও মৃত আসামিদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ হয়েছে। আশা করছি, রায়ে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিবে ট্রাইব্যুনাল।’
এদিকে পরিবার ও বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশা, আদালত সুষ্ঠু রায় দেবেন। আদালতের ওপরে তাদের আস্থা ও বিশ্বাস আছে।
২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল সকালে রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকায় নিজের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে কুপিয়ে ও গলাকেটে হত্যা করা হয় অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে। পরদিন নিহতের ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে বোয়ালিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর ৮ জনকে আসামি করে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজশাহী মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক রেজাউস সাদিক। চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার অভিযুক্ত ৮ আসামির মধ্যে খায়রুল ইসলাম বাঁধন, নজরুল ইসলাম ওরফে হাসান ওরফে বাইক হাসান ও তারেক হাসান ওরফে নিলু ওরফে ওসমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।
অভিযুক্ত অন্যরা হলেন, বগুড়ার শিবগঞ্জের মাসকাওয়াত হাসান ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে সাকিব, নীলফামারী জেলার মিয়াপাড়ার রহমত উল্লাহ, রাজশাহী মহানগরীর নারিকেলবাড়িয়া এলাকার আবদুস সাত্তার ও তার ছেলে রিপন আলী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী শরিফুল এখনও পলাতক। আবদুস সাত্তার রয়েছেন জামিনে। আর বাকি আসামিরা রয়েছেন কারাগারে।
এদিকে রায়ের বিষয়ে বিভাগের সভাপতি ড. এএফএম মাসউদ আখতার বলেন, ‘রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায় প্রদান করবেন আদালত। আশা করছি, প্রশাসন আমাদের কোনও ধরনের হয়রানি করবে না। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’
অধ্যাপক রেজাউল করিমের মেয়ে রিজওয়ানা হাসিন শতভি বলেন, ‘আদালতের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে। রায় প্রদান না করা পর্যন্ত এর বেশি মন্তব্য করতে পারছি না। আশা করি, আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায় তেবেন আদালত। রায় দিলেই বোঝা যাবে কতটুকু সুষ্ঠু বিচার হয়েছে।’
তবে এ মামলার আসামি জেএমবির শরিফুল এখনও গ্রেফতার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে রিজওয়ানা হাসিন শতভি বলেন, ‘শরিফুল বাবাকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। সে এখনও গ্রেফতার হলো না। এই বিষয়টা আমাদের খুব পীড়া দেয়। আমরা তো তার বিচারই আগে দেখতে চাই।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের তালিকায় থাকা শীর্ষ ‘জঙ্গি’ শরিফুল অধ্যাপক রেজাউলের ছাত্র ছিল। বাগমারা উপজেলায় তার বাড়ি। অধ্যাপক রেজাউলের গ্রামের বাড়িও বাগমারায়। তাই তাদের মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই শরিফুল পলাতক। শরিফুলকে ধরিয়ে দিতে রাজশাহী মহানগর পুলিশ দুই লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু এখনও তার হদিস পাওয়া যায়নি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আটক আইএস জঙ্গি মসিউদ্দীন ওরফে মুসার সঙ্গে বাংলাদেশের এই শরিফুল ইসলামের সম্পৃক্ততা পেয়েছে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। শরিফুলের সঙ্গে জঙ্গি মুসার সরাসরি টেলিফোনে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল। তারা বড় ধরনের ঘটনা ঘটানোর পরিকল্পনা করেছেন। শরিফুল মুসাকে কলকাতাসহ ভারতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিদেশিদের হত্যা, জনবহুল স্থানে বিশেষ করে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন। কলকাতায় মাদার তেরেসার মিশনারি সংগঠনের সদর দফতর মাদার হাউসকে আক্রমণের তালিকায় রাখতে বলা হয়। পরামর্শ দেওয়া হয় পর্যায়ক্রমে দিল্লি ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে সর্বশেষ পরিস্থিতি বুঝে কাজ করার। ভারতের তদন্ত সংস্থা শরিফুল ও মুসার এমন অনেক তথ্য, কথোপকথন, সামাজিক যোগাযোগের প্রমাণ অনুসন্ধান করে বের করেছে। এনআইএ এর দাবি, শরিফুল ২০১৫ ও ২০১৬ সালে তিনবার ভারতে গিয়েছেন। শরিফুলের ব্যবহৃত দুইটি মোবাইল নম্বর দিয়ে আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তবে মোবাইল অন্য ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন করা। এছাড়া মুসার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হয় ফেসবুক, স্কাইপ, টেলিগ্রাম, থ্রিমা প্রভৃতি ব্যবহার করে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতেখায়ের আলম বলেন, ‘শরিফুলের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করছে। তার সন্ধান পেলেই আইনশঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করবে।








