রাজশাহীতে টানা কয়েকদিনের ঘন কুয়াশা ও মৃদু শৈত্যপ্রবাহে আলু এবং বোরোর বীজতলা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। এরমধ্যে বীজতলার চারা লালবর্ণ ধারণ ও আলু আবাদে লেট ব্লাইটের আশঙ্কায় চাষিরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, এখন পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ও শৈত্যপ্রবাহে রাজশাহীতে কৃষির কোনও ক্ষতি হয়নি। তবে এ অবস্থা চলতে থাকলে আলুর আবাদ ও বীজতলার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এবার বোরো মৌসুমে রাজশাহীতে বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৬৩ হেক্টর জমিতে। বীজতলায় চারাগাছ রোপন করা হয়েছে ২ হাজার ৩৫৩ হেক্টর জমিতে। আর চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে আলুচাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ১৫৬ হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ৩৭ হাজার ৯৭১ হেক্টরে। গত বছর রাজশাহীতে আবাদ হয়েছিল ৪০ হাজার ৩৬১ হেক্টর জমিতে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছির নওদাপাড়ার আলুচাষি আলাউদ্দিন আহম্মেদ জানান, এবার তিনি ৪ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছেন। এখন পর্যন্ত আবাদ ভালো আছে। তার এলাকার অন্য চাষিদের আবাদও ভালো আছে। তবে খারাপ আবহাওয়ার কারণে আলুর রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়তে পারে। এজন্য তারা জমিতে নিয়মিত বালাইনাশক স্প্রে করছেন।
দুর্গাপুর উপজেলার হাটকানপাড়ার আলু চাষি ফিরোজ আলী জানান, তিনি ৯৫ বিঘা জমি লিজ নিয়ে এবার আলু চাষ করেছেন। শুরু থেকে এবার যেন ভাগ্য সহায়। কনকনে ঠান্ডা সত্ত্বেও নাভিধসা (লেট-ব্লাইট) ও কান্ড পচা (স্ট্যামরড) রোগ এবং ঘনকুয়াশা না থাকার কারণে আলু গাছের চেহারা অনেক ভালো। এখন পর্যন্ত আবহাওয়ার কোনও বিরূপ প্রভাব পড়েনি। তাছাড়া তার জমির আলুসহ আশে পাশের প্রায় সব আলুর ক্ষেত এবছর এখন পর্যন্ত অনেক ভালো বলে জানান তিনি। তবে শৈত্যপ্রবাহ চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত আলু ক্ষেতের কোনও ক্ষতি হয় কিনা তা নিয়ে তারা শঙ্কিত রয়েছেন। যারা মৌসুমের শেষের দিকে তাদের জমিতে আলু চাষ করেছেন।
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মসিউর রহমান জানান, উপজেলার আলু চাষিরা এখন পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যে আলু ঘরে তোলা সম্ভব হবে। আর বাকি আলুগুলো মাসের শেষের দিকে উঠবে। উপজেলায় প্রায় এলাকায় এবার আলুর ফলন ভালো হয়েছে। তাছাড়াও এবার এখন পর্যন্ত বৈরি আবওহায়া না হওয়ায় আলু চাষিরা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন।
তানোর উপজেলার চিমনা গ্রামের হাবিবুর রহমান, মিজানুর রহমান, রবিউল ইসলাম ও মুণ্ডুমালা পৌর এলাকার মোজাহার আলী রহমান জানান, পৌষের ১৫ থেকে মাঘের ১৫ তারিখ পর্যন্ত হচ্ছে বোরো চারা রোপনের উপযুক্ত সময়। এজন্য জমি প্রস্তুতের কাজ শুরু করছেন তারা। আর বীজতলার চারার বয়স ১৫ থেকে ২০ দিন হয়েছে। এ অবস্থায় ঠান্ডা আর কুয়াশায় বীজতলার চারা লালবর্ণ ধারণ করেছে।
মোহনপুর উপজেলার গোছা গ্রামের কৃষক আইয়ুব আলী জানান, শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে বোরো ধানের বীজতলার চারাগাছ হলুদ হয়ে গেছে। ছত্রাকনাশক পাউডার স্প্রেসহ ঢেকে রাখা হয়েছে। এরপরও যদি চারা নষ্ট হয়, তাহলে পুনরায় বীজ বপন করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।
মোহনপুর উপজেলা কৃষি অফিসার রহিমা খাতুন জানান, শীতজনিত কারণে বীজতলার চারাগাছ হলুদ হতে পারে। এজন্য কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। রাতের বেলায় বীজতলা ঢেকে রেখে এবং দিনের বেলায় রোদে ফাঁকা করে রাখলে চারা ভাল থাকবে। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া কেটে গেলে দ্রুত চারা গাছ সতেজ হয়ে উঠবে বলে আশাবাদী তিনি।
বাগমারা উপজেলার মাড়িয়া ইউনিয়নের কৃষক হাফিজুর রহমান জানান, বীজতলা রক্ষায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। একই উপজেলার হামিরকুৎসা ইউনিয়নের আলোনগর গ্রামের আব্দুল মান্নান, আব্দুর রাজ্জাক, কালুপাড়ার জোনাব আলী জানান, তাদের বপন করা বীজতলা তীব্র শীতের কারণে চারা বৃদ্ধি পাচ্ছেনা। শুরুতেই বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। মৌসুমের শুরুতে বীজ সংকট দেখা দিতে পারে।
বাঘা উপজেলার লক্ষ্মীনগর চরের চাষি আজিবর রহমান বলেন, অতিরিক্ত শীত ও কুয়াশায় ধানের চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বীজতলা নষ্ট হয়ে গেলে চারা সংকট দেখা দিতে পারে।
বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান বলেন, ‘কয়েক দিনের শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশার কারণে বোরো ধানের অধিকাংশ বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আমরা অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা এবং পরিমাণ মতো সার ও পানি দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি কৃষকদের। তাহলে ক্ষতি কমে আসবে।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শামসুল হক জানান, এখন পর্যন্ত রাজশাহীতে এই আবহাওয়ায় ফসলের কোনও ক্ষতি হয়নি। তবে এই আবহাওয়া চলমান থাকলে বোরো ধানের বীজতলা ও আলুর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষত্রে কৃষকদেরকে বিকালে বীজতলায় পানি দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আর ঘন কুয়াশা থাকলে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শ দিচ্ছি।








