আলুর ভালো ফলনের জন্য প্রয়োজন অপেক্ষাকৃত শীতল আবহাওয়া।রাজশাহীতে অনেক আগেই শীতের আগমন ঘটলেও এবার শীতের তীব্রতা কম।কনকনে ঠাণ্ডা এখনও পড়েনি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি দেখা দিলেও চিন্তিত রাজশাহী অঞ্চলের আলুচাষীরা। আলুর ফলন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এবার রাজশাহী অঞ্চলে আলুর আবাদ হচ্ছে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে বাগমারা উপজেলায় ১৩ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হচ্ছে। রাজশাহী অঞ্চলের ৯টি উপজেলা ও ২টি থানার মধ্যে তানোরে ৮ হাজার ৫৫০, মোহনপুরে ৬ হাজার ৪৫০, পবা উপজেলায় ৫ হাজার ও দুর্গাপুরে ৩ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হচ্ছে।
এছাড়া গোদাগাড়ীতে ২ হাজার ১৫, পুঠিয়ায় ১ হাজার, বাঘায় ৪৩৫, চারঘাটে ৭২, বোয়ালিয়ায় ৯৬ ও মতিহার থানায় ৭২ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করছেন কৃষকরা। এই অঞ্চলে কার্ডিনাল ও ডায়মন্ড জাতের আলুর বেশি আবাদ হচ্ছে। এখানকার কৃষকরা ১৮ হাজার ২৯৬ হেক্টরে ডায়মন্ড ও ১৩ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমিতে কার্ডিনাল জাতের আলুর বীজ লাগিয়েছেন। অনেক চাষি ভালো ফলনের আশায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমিতে লালপাকড়ি, ২ হাজার ৯৯ হেক্টরে এস্টারিক ও বার্মা জাতের বীজ আলুর চাষ করছেন। গ্রানোলা ও কুপরিসুন্দরী জাতের আলুর বীজ কেউ কেউ চাষ করছেন। তবে পলেন জাতের বীজ আলু কেউ লাগাননি বলে জানা গেছে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে আলুর বীজ লাগানো শেষ করেছেন কৃষকরা। গাছের আকার বড় হতে শুরু করেছে। কিন্তু আলু গাছে লেগেছে মোড়ক। এর পাশাপাশি জমিতে ইঁদুরের আক্রমণও বেড়েছে। এনিয়ে মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌর এলাকার হরিদাগাছি গ্রামের আলুচাষী আবদুল কাদের তার জমির ওপর দাঁড়িয়ে বলেন,‘জমিতে ইঁদুরের আক্রমণ হয়েছে। অনেক পদ্ধতি প্রয়োগ করে কোনও ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি কৃষি অফিসের পরামর্শও কাজে লাগছে না।’ শুধু আবদুল কাদের নয়,একই অভিযোগ বিষহারা গ্রামের কৃষক সোহরাব হোসেন ও মোখলেসুর রহমানেরও।
মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ খয়ের উদ্দিন মোল্লা বলেন,‘আলু খেতে ইঁদুরের আক্রমণরোধে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অনেক কৃষক আমাদের পরামর্শে ফল পাচ্ছেন। অনেকে আবার পাচ্ছেন না। এনিয়ে আমরাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
গত কয়েক বছরে হরতালসহ নানা কারণে তানোরের চাষীরা আলু উৎপাদন করে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাননি। অনেকে আবার আলু চাষ করে খরচও উঠাতে পারেনি। এবার ভালো ফলনের আশায় ও বিগত বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আলু চাষ করছেন অনেক কৃষক। তাদেরই একজন তানোর উপজেলা পাঁচন্দর ইউনিয়নের চিমনা গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান।
তিনি বলেন,‘গত বছর ১২ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছিলাম। প্রতিবিঘা জমিতে ৯৫ কেজি করে ৫০ বস্তা আলু উৎপাদন হয়েছিল। তবে চাহিদা অনুযায়ী দাম পাইনি।’
কাজিপাড়া গ্রামের মোমিনুল হক বলেন,‘গত মৌসুমের চেয়ে এবার শীত এসেছে অনেক আগে। তাই দীর্ঘমেয়াদী কনকনে ঠাণ্ডা থাকলে এবার আলুর ফলন ভালো হবে।’
তানোর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন,‘সারের কোনও সমস্যা নেই। আলুর গাছ পরিচর্যার জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা পাচ্ছেন কৃষকরা। তাই গতবারের চেয়ে এবার কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
বাগমারা উপজেলার মচমইল এলাকার কৃষক আসলাম বলেন,‘অন্যের জমি লিজ নিয়ে এবার ৪০ বিঘায় আলু চাষ করছি। তাই খরচও বেশি হয়েছে। প্রতি বিঘায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা করে খরচ হবে। কীটনাশক থেকে শুরু করে কৃষি কাজে ব্যবহৃত সব জিনিসপত্রের অধিক দাম। ৪০ থেকে ৫০ দিন আলুর বয়স হলেও আবহাওয়া প্রচণ্ড ঠাণ্ডা না হওয়ায় এক প্রকার শঙ্কায় আছি।’
রাজশাহী মহানগরীর গ্রেটার রোড এলাকার খোকন তালুকদার এবার পবা উপজেলায় ২২৫ বিঘা জমি লিজ নিয়ে আলু চাষ করছেন। কিন্তু তাপমাত্রা বেশি থাকায় আলুর ফলন নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি। তিনি বলেন,‘ব্যাংকে ঋণ নিয়ে আলু চাষ করছি। ভালো ফলন না হলে সবদিক থেকে ক্ষতি হবে।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন,‘আলুর ফলন ভালো হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদী কনকনে ঠাণ্ডার প্রয়োজন। আশাকরি ঠাণ্ডা পড়বে। কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের সব রকম সহযোগিতা করা হচ্ছে। তারা যেন এবার ভালো ফলন পায়।’
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এবারের শীতে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ছিল ৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আর্দ্রতা ৪৯ শতাংশ। সামনে কনকনে ঠাণ্ডা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
আলু চাষের পাশাপাশি চলছে কোল্ড স্টোরেজের বুকিং প্রক্রিয়া। তানোর এম কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার জালাল উদ্দিন বলেন,‘আমাদের এখানকার ধারণ ক্ষমতা হচ্ছে ১ লাখ ৭৫ হাজার বস্তা। এরইমধ্যে কৃষকরা অগ্রীম বুকিং দিয়ে ফেলেছেন। এখন জমি থেকে ভালোভাবে আলু এনে কোল্ড স্টোরেজে রাখতে পারলেই ভালো।’
/জেবি/এমএসএম/টিএন/আপ-এআর/








