এ যেন অবিশ্বাস্য রূপকথা। বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়লো মানুষের জটলা। সামনে যেতেই দেখা গেলো সবাই ঘিরে রেখেছেন এক বৃদ্ধাকে। প্রায় ২৩ বছর পর মায়ের ফিরে আসা। আশপাশে বসে আছেন স্বজনরা। সবাই জানার চেষ্টা করছেন কোথায় ছিলেন এতদিন, কীভাবে গেলেন, কার সঙ্গে গেলেন? বৃদ্ধা মায়ের উত্তর, ‘মনে পড়ছে না, বাগবাড়ি গিয়েছিলাম, বহু মানুষের ভিড় দেখলাম, আর কিছু জানি না।’
২২ বছর ৮ মাস নিখোঁজ থাকার পর নেপাল থেকে বাড়ি ফিরে স্বজন ও প্রতিবেশীদের এমন কথা জানালেন আমেনা খাতুন (৮০)। বৃদ্ধ ও মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় কারও প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি এই মা। তবে স্বজনদের কাছে পেয়ে অনেক খুশি তিনি।
সোমবার (০৬ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে বগুড়ার ধুনট উপজেলার চিকাশী ইউনিয়নের ছোটচাপড়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেন আমেনা। তাকে পেয়ে আবেগাপ্লুত স্বজনরা। মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন সন্তানরা, কেঁদেছেন আমেনাও। একই দিন দুপুরে হজরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমেনাকে গ্রহণ করেন স্বজনরা।
মঙ্গলবার (০৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ছোটচাপড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আমেনাকে দেখতে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ শত শত মানুষ বাড়িতে ভিড় করছেন। তাদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন পরিবারের লোকজন।
কীভাবে নেপাল গেলেন তা মনে নেই জানিয়ে আমেনা খাতুন বলেন, ‘সেদিন বাড়ি থেকে গাবতলীর বাগবাড়িতে গিয়েছিলাম। এরপর দেখি মানুষের লাইন, বড় মন্দির। বহু মানুষের ভিড় দেখেছি, সবাই কোথায় যেন যাচ্ছেন। আর কিছু মনে পড়ছে না।’
আমেনা বলেন, ‘এরপর দেখি সবাই বিদেশি। সেখানে (নেপালে) একটি হোটেলে ধোয়ামোছার কাজ করে কিছু টাকা পেয়েছি। তা দিয়ে সেখানে ৩০০ টাকায় ঘর ভাড়া নিই। আর কিছু মনে নেই।’ একপর্যায়ে অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করেন আমেনা।
স্বজনরা জানিয়েছেন, উপজেলার নিমগাছি ইউনিয়নের মাজগ্রামের কাঠমিস্ত্রি আজগর আলী প্রামাণিক প্রায় ৬৫ বছর আগে ছোটচাপড়া গ্রামের আমেনা খাতুনকে বিয়ে করেন। তার ঘরে তিন ছেলে এক মেয়ে। তারা হলেন আমজাদ হোসেন প্রামাণিক, ফটিক মিয়া প্রামাণিক ও ফরিদ মিয়া প্রামাণিক এবং আম্বিয়া খাতুন। পরবর্তী সময়ে আজগর আলী প্রামাণিক শিয়ালী গ্রামে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই ঘরে তোতা প্রামাণিক, গণি প্রামাণিক ও জোস্না বেগমের জন্ম হয়। মূলত স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের পর মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন আমেনা।
প্রতিবেশীরা জানান, ঘরে সতিন আসায় অভিমানে বাড়ি ছাড়েন আমেনা। হয়তো তীর্থযাত্রী হিসেবে পাসপোর্ট ছাড়াই ভারত হয়ে নেপালে গেছেন।
প্রতিবেশী বৃদ্ধ আবদুর রাজ্জাক প্রামাণিক বলেন, ‘দ্বিতীয় বিয়ের পর আমেনা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। অনেক চঞ্চল প্রকৃতির নারী আমেনা। বিয়ের আগে সাঁতরে বাঙালি নদী পার হতেন। মাঠেঘাটে সব ধরনের কাজ করতে পারতেন।’
আমেনার বড় ছেলে আমজাদ হোসেন প্রামাণিক বলেন, ‘বাবার দ্বিতীয় বিয়ের আগে থেকেই মা মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। বিয়ের পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তাকে একাধিকবার পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর আগে দুবার নিখোঁজ হয়েছিলেন। একবার প্রায় ছয় মাস পর বাড়ি ফিরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৯৫ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর মা আরও বেশি অসুস্থ হন। ১৯৯৮ সালে মেজো ভাই ফটিক সৌদিআরবে চলে যায়। এর প্রায় তিন মাস পর হঠাৎ মা নিখোঁজ হন। অনেক খোঁজাখুুঁজি করেও পাওয়া যায়নি। সবাই ধরে নিই মারা গেছেন।’
আমজাদ হোসেন বলেন, ‘মৃত মা এত বছর ফিরে এসেছেন—এর চেয়ে বড় খুশি আর কিছুই হতে পারে না। মাকে কাছে পেয়ে আমরা অনেক আনন্দিত।’
মেয়ে আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘মা বেঁচে আছেন প্রথমে শুনে অবিশ্বাস্য লাগছিল। শোনার পর থেকে দেখার জন্য অস্থির ছিলাম। দেখার পর বিশ্বাস হলো মা বেঁচে আছেন।’
আমেনার নাতি চিকাশী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও ধুনট ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ফাহিমুল ইসলাম নূর বলেন, ‘প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে এলাকার একটি হোটেলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলেফ বাদশার সঙ্গে বসে চা পান করছিলাম। এ সময় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) বগুড়ার সহকারী পরিচালক রবিউল ইসলাম ফোনে চেয়ারম্যানকে জানান নিখোঁজ আমেনা খাতুন নেপালে আছেন। তিন দিন পর এনএসআই অফিসে যাই। গত ৩ সেপ্টেম্বর নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার মো. মাসুদ আলম ভিডিওকলে আমেনার সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করেন। ভিডিওকলে দাদিকে দেখে চিনতে পারি। এরপর দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।’
আমেনার নাতি নন্দীগ্রাম রেজিস্ট্রি অফিসের নকল নবিশ আদিলুর রহমান আদিল বলেন, ‘দাদি প্রায় ৪০ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন। সরকারের সহযোগিতায় দাদিকে ফিরে পেয়েছি। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কনস্যুলার মাসুদ আলমসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’
এনএসআইয়ের বগুড়ার পরিচালক মাহমুদুল হাসান ও সহকারী পরিচালক রবিউল ইসলাম জানান, মূলত নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার মো. মাসুদ আলমের সার্বিক সহযোগিতায় আমেনাকে পরিবারের কাছে ফিরে দিতে পেরেছি।
বর্তমানে ছেলে আমজাদ হোসেনের কাছে রয়েছেন আমেনা খাতুন। তবে তার স্বামীর ঘর রয়েছে। সেখানে সতিন ও তার সন্তানরা থাকেন। ছেলের বাড়িতে নাকি স্বামীর বাড়িতে থাকবেন আমেনা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি তার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন স্বজনরা।
এ বিষয়ে আমজাদ হোসেন বলেন, ‘দ্বিতীয় মা ও তার সন্তানদের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। তবে মা কোথায় থাকবেন তা নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন।’
চিকাশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাজমুল কাদির শিপন বলেন, নিখোঁজ আমেনা বাড়িতে এসেছেন শুনেছি। তবে সময়ের অভাবে দেখতে যেতে পারিনি।









