নওগাঁয় সূর্যমুখী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের প্রায় ৩২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জামানতের টাকা তুলতে না পেরে আদালতে মামলাও করেছেন ওই সমিতির দুই জামানতকারী।
উপজেলা সমবায় অফিস ও সমিতির গ্রাহক সূত্রে জানা যায়, সূর্যমুখী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে ২০১৩ সালে সমবায় অধিদফতরের নিবন্ধন পায়। যার নিবন্ধন নম্বর ৯৩৩। ওই সমিতির সভাপতি নওগাঁ সদর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ইকড়কুড়ি গ্রামের মোহাম্মদ আলী সরদার ও তার ছেলে স্বপন হোসেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক। ওই বছর থেকেই তারা লোভনীয় লভ্যাংশের আশ্বাস দিয়ে ইকড়কুড়ি, ভবানীপুর ও বোয়ালিয়া গ্রামের মানুষের কাছ জামানত আদায় করেন।
সূত্রে আরও জানা যায়, সমিতিটিতে মাসিক আমানত জামানতকারী গ্রাহকের সংখ্যা ৪৩ জন। এদের আমানতের মোট পরিমান ৩২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। গত সাত-আট মাস ধরে সমিতিটির যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্প্রতি গ্রাহকরা লভ্যাংশসহ জামানতের টাকা চাইতে গেলে তাদেরকে কোনও টাকা পরিশোধ করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন প্রতিষ্ঠানটির মূল কর্ণধার স্বপন হোসেন ও তার বাবা মোহাম্মদ আলী সরদার।
এদিকে জামানতের টাকা তুলতে না পেরে ইকড়কুড়ি গ্রামের রেজাউল ইসলাম নামে এক গ্রাহক নওগাঁ আদালতে ও একই গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস নামে আরেক গ্রাহক ৮ লাখ টাকার চেক অবমূল্যায়নের মামলা করেন বগুড়া আদালতে।
সরেজমিনে ইকড়কুড়ি গ্রামে সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, তিন কক্ষ বিশিষ্ট টিনের বেড়া ও ছাউনি দেওয়া একটি বাড়িতে সূর্যমুখী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লি. এর সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে কার্যালয়টি বন্ধ দেখতে পাওয়া যায়।
সমিতির গ্রাহক রেজাউল ইসলাম বলেন, প্রতি লাখে মাসিক তিন হাজার টাকা মুনাফার আশ্বাস দেয় স্বপন। তার দেওয়া আশ্বাসে আমি ওই সমিতিতে দুটি হিসাব (হিসাব নম্বর ১০০ ও ১৭) খুলি। এর মধ্যে ১০০ নম্বর হিসাবে ৭৮ হাজার টাকা ও ১৭ নম্বর হিসাবে ৩ লাখ ৯ হাজার টাকা জামানত রাখি। গত বছরের অক্টোবর মাসে লভ্যাংশসহ জমা দেওয়া টাকা চাইতে গেলে দেব-দিচ্ছি বলে টালবাহানা করতে থাকে। এক পর্যায়ে স্বপন আমাকে কোনও টাকা দিতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। বাধ্য হয়ে আমি এলাকার মাতব্বরদের কাছে যাই। তাদের কাছে আমার টাকা পরিশোধ করার জন্য তিন মাসের সময় চান স্বপন। সেই সময় পার হয়ে গেলেও আমার পাওনা টাকা না পেয়ে গত ১৫ ডিসেম্বর নওগাঁ আদালতে আমি মামলা করেছি।
ওই সমিতির মাঠকর্মী ও সমিতির একজন জামনতকারী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমি ওই সমিতিতে শুরু থেকেই মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করতাম। স্বপনের সমিতিতে অধিক লাভের আশ্বাসে লোকজনকে আমানত রাখার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করেছি এবং আমি নিজেও ওই সমিতিতে একটি আমানত খুলি (হিসাব নম্বর- ১০৩)। ওই হিসাবে আমার ৮ লাখ টাকা পাওনা আছে। আমানতের টাকা চাইতে গেলে গত ৫ নভেম্বর স্বপন আমাকে জনতা ব্যাংকের এসবি-১০/এফসি-৭২০১৭৬৯ হিসাবে ৮ লাখ টাকা একটি চেক দেয়। চেকটি ব্যাংকে নগদায়নের জন্য জমা দিলে ‘ডিসঅনার’ হয়। পরে চেক ডিসঅনার হওয়ায় আইনজীবীর মাধ্যমে গত ৩০ নভেম্বর বগুড়া আদালতে মামলা করি। মামলাটি এখন বিচারাধীন রয়েছে।
এ বিষয়ে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকিরুল ইসলাম বলেন, টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪০৬, ১০৯ ও ৫০৬ ধারায় আদালতে একটি মামলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে। শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।
অভিযুক্ত স্বপন হোসেন কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত কয়েক মাস ধরে আমার সমিতি ক্ষতির মুখে পড়ে গেছে। এজন্য সমিতির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এখন আমানতকারীরা টাকা চাচ্ছেন। টাকা দেওয়ার জন্য তাদের কাছ থেকে কিছু সময় চেয়েছি। কেউ মানতে চাচ্ছেন, কেউ চাচ্ছেন না। জমি বিক্রি করে হলেও আমি আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করে দেবো।
আমানতের টাকা ফেরত পাওয়া প্রসঙ্গে সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত সমবায় কর্মকর্তা মাহবুব আলম জানান, নিবন্ধন পাওয়ার প্রথম দুই-এক বছর সমিতিটির কার্যক্রম ভালোই চলছিল। কিন্তু বিগত সাত-আট মাস ধরে সমিতিটির কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়। অডিটে গিয়েও সমিতিটির কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সমিতির কয়েকজন গ্রাহক অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে মৌখিক অভিযোগ করলেও এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। তবে আদালতে মামলা হওয়ায় বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছি। সত্যতা পেলে সমিতিটির নিবন্ধন বাতিল করা হবে।
/এআর/








