দুই বছর বয়সেই বাবাকে হারান অন্তরা খাতুন। এরপর অনেক দুঃখে-কষ্ট সয়ে এগোতে হয় তাকে। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ থাকায় মা রসুনারা বিবি গৃহকর্মীর কাজ করে মেয়ের পড়াশোনার খরচ যুগিয়েছেন। অন্তরাও মায়ের কষ্টের প্রতিদান দিয়েছেন। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সব পরীক্ষায় রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। এবার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরীক্ষার মধ্যদিয়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে ভর্তির টাকা নেই বলে দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না মা-মেয়ের।
বিষয়টি জানতে পেরে অন্তরার পাশে দাঁড়িয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটলিয়নের (র্যাব) সদস্যরা। রবিবার (১০ এপ্রিল) র্যাব-৫ এর অধিনায়কের পক্ষ থেকে অন্তরার বাড়িতে যান ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মারুফ হোসেন খান। তিনি অন্তরা, তার মা ও নির্মাণ শ্রমিক ভাইয়ের হাতে তুলে দেন মেডিক্যালে ভর্তির যাবতীয় খরচ।
জানা যায়, অন্তরার বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চন্ডীপুর গ্রামে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন তিনি। এতদিন গ্রামের স্কুল-কলেজেই পড়াশোনা করেছেন তিনি। এবার ভর্তির টাকা নিশ্চিত হওয়ায় অদম্য এই মেধাবী যাবেন গ্রামের বাইরে।
মেডিক্যালে ভর্তির সহায়তা পেয়ে অন্তরা বলেন, আর্থিক অনটনের মধ্যেও নিজের ইচ্ছাশক্তি আর সবার দোয়ায় আজকের পর্যায়ে এসেছি। কিন্তু আমার পরিবারের পক্ষে মেডিক্যালে ভর্তির টাকা জোগাড় করা কষ্টকর ছিল। বিষয়টি জানার পর র্যাব-৫ আমাকে ভর্তির টাকা দিয়ে সহযোগিতা করায় আমি অত্যন্ত খুশি এবং কৃতজ্ঞ। এ সহায়তা সব সময় মনে থাকবে।
এ বিষয়ে র্যাব-৫ এর দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অন্তরা রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাজুবাঘা ইউনিয়নের চন্ডিপুর বড় ছয়ঘটি গ্রামে বসবাস করে। বাবা আলাউদ্দিন তার দুই বছর বয়সে মারা যান। ভাই সোহেল রানা টাকার অভাবে পড়তে পারেননি। বর্তমানে তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। মা রসুনারা বিবি অনেক কষ্টে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়েছেন। অন্তরা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চন্ডিপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সফলতার সঙ্গে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তারপর তার লেখাপড়ার চালিয়ে যেতে কোনও অর্থ সংগ্রহ করতে পারছিলেন না রসুনারা বেগম। নিরুপায় হয়ে পড়েন তিনি। কোনও উপায় না পেয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গাভী পালন করে দুধ বিক্রি করে মেয়েকে ভর্তি করেন বাঘা সরকারি শাহদৌলা কলেজে। সেখান থেকেও অন্তরা সফলতার সঙ্গে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।
অন্তরার মা রসুনারা বিবি বলেন, মেয়ে মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়েছে। মেয়ের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ভর্তির টাকা জোগাড় করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম। খুব কষ্টে চলে তিন সদস্যের পরিবার। তবে র্যাব সদস্যরা আমার মেয়ের ভর্তির টাকা দিয়েছেন। এতে আর তার ভর্তিতে কোনও সমস্যা রইলো না।
অন্তরা খাতুন আরও বলেন, প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পড়ালেখা করেছি। পাশাপাশি প্রতিবেশী ছেলে-মেয়েদের প্রাইভেট পড়িয়েছি। আবার কখনও কখনও মায়ের সঙ্গে হাতের কাজ করেছি। এই আয় থেকেই নিজের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চলেছে সংসারের খরচ।
এ বিষয়ে বাজুবাঘা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চন্ডিপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, অন্তরা নিজের চেষ্টায় পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এবার এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। সবার সহযোগিতা পেলে অন্তরা ভালো করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।









