স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন মো. আব্দুর রশীদ মিয়া। এবার এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। গত মঙ্গলবার তাকে নিয়োগ দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চলতি দায়িত্বে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ মাথায় নিয়ে অবসরেও যান। বিএনপি সরকার অবসর থেকে নিয়ে এসে রশীদ মিয়াকে আবার প্রধান প্রকৌশলী করেছেন। ২৪ মার্চ তাকে নিয়োগ দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে চলতি দায়িত্বে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন রশীদ মিয়া। এরপর অবসরে যান।
তবে শুক্রবার (২৭ মার্চ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে নিয়োগের আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। আগামী রবিবার এ নিয়ে নতুন করে আদেশ জারি হবে।
তবে তাকে প্রধান প্রকৌশলী করে আদেশ জারি করায় প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীরা অবাক হয়েছেন। কারণ অনিয়ম-দুর্নীতির অনেক অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুদকে তদন্ত চলমান। এমনকি প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার আগে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুদকের তদন্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। দুদকের অনুসন্ধানের মধ্যে পেয়েছেন পদোন্নতি। একাধারে আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ও দেশের অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামতের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পান তিনি।
রশীদ মিয়ার অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে এ ধরনের নিয়োগ দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই নিয়োগ কেন্দ্র করে বড় ধরনের লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সাল থেকে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। এর পরের বছর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান তিনি। অভিযোগের কোনও সুরাহা না হলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাকে চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী পদে বসায়। এরপর বর্তমান সরকার এসে তাকে আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। যদিও পরে আদেশ স্থগিতের কথা জানানো হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির এক প্রকৌশলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভিন্নমতের প্রকৌশলীরা সবসময়ই বঞ্চিত ছিলেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ দিয়ে তাদের ডাম্পিং পোস্ট দেওয়া হতো। হাজারের বেশি মানুষ রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদ বিদায় করলো, কিন্তু এলজিইডি থেকে তার দোসরদের বিদায় করতে পারলাম না।’
আরেক প্রকৌশলী বলেন, ‘আব্দুর রশীদ মিয়া আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী। অন্তর্বর্তী সরকারও তাকে পুরস্কার দিয়েছে। আর বিএনপি সরকার এসে অবসর ভাঙিয়ে আবার তাকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার পদে বসালো। তিনি যে আবার চিফ হবেন, এটা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।’
প্রকৌশলীদের ভাষ্য, যারা ১৭ বছরে বঞ্চিত ছিলেন তাদের হাতে টাকা নেই। তাই তারা চাইলেও নিজেদের কাঙ্ক্ষিত পোস্টে যেতে পারছেন না। এ নিয়ে বিএনপিপন্থি জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভও বিরাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহিদুল হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি-বাণিজ্য এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন আব্দুর রশীদ মিয়া। তিনি এলজিইডির বিভিন্ন পদে থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকল্প বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং বরাদ্দের বড় অংশ তার ঘনিষ্ঠদের হাতে চলে যেতো।
রশীদ মিয়ার স্ত্রী ফাতিমা যাকিয়াহ ও আত্মীয়দের নামে পরিচালিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ১ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রকল্পে কাজ পেয়েছে। অভিযোগ আছে, প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা, প্রতিযোগীদের তুলনায় তাদের বেশি অর্থ বরাদ্দ করা এবং সুনির্দিষ্ট ঠিকাদারি গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
এর আগেও তৃতীয় গ্রেডের এই কর্মকর্তাকে সিনিয়রিটি না মেনে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তবর্তী সরকার। বিতর্কিত এই কর্মকর্তার নিয়োগের বিষয় পুনর্বিবেচনা করার দাবি এলজিইডির সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর।
দুদকের অভিযোগ থেকে আরও জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় আব্দুর রশীদ মিয়ার নামে একাধিক সম্পদ রয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডিতে ছয়তলা বাড়ি এবং গুলশান, বনানী ও বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট এবং প্লট রয়েছে। রাজশাহীতে পাঁচ ও সাততলা দুটি বাড়ি এবং একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে তার নামে। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে ফুড গার্ডেন নামে ব্যবসা চালাচ্ছেন, পাশাপাশি বগুড়ার শেরপুর, হিমছায়াপুর ও শাহবন্দেগী ইউনিয়নে বিশাল জমি ও বাগানবাড়ি রয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এই সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য ৭০ কোটি টাকা। এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রার্থীপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ লেনদেনেরও অভিযোগ আছে।
এলজিইডির প্রশাসন ও ট্রেনিং বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রশীদ মিয়া প্রায় ৩০০ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই সম্পদের বড় অংশই তার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও নিকটাত্মীয়দের নামে। অভিযোগের তদন্তের জন্য দুদক থেকে বারবার তাকে তলব করা হলেও হাজির হননি। প্রথমবার অসুস্থতা, পরেরবার বিদেশ সফর এবং আরও একবার অফিসের ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি নোটিসে সাড়া দেননি। দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু থেকেই আব্দুর রশীদ মিয়া অসহযোগিতা করছেন বলে জানিয়েছেন দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
এসব বিষয়ে আব্দুর রশীদ মিয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এজন্য তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি অবাক হওয়ার মতো। যে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকার এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেবে, এটা অগ্রহণযোগ্য। যদি এমন হতো যে তার চেয়ে যোগ্য আর কেউ নেই অথবা দুর্নীতির অভিযোগ ছাড়া কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে এটা ঠিক বলা যেতো। কিন্তু দুটি মানদণ্ডে এটি অগ্রহণযোগ্য। প্রথমত, তিনি অবসরে গেছেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এনে কেন নিয়োগ দিতে হবে? এখানে কি আর যোগ্য কেউ নেই? দ্বিতীয়ত, তিনি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনোভাবেই এ সরকার তাকে নিয়োগ দিতে পারে না। এই নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করা দরকার। এলজিইডি এমনিতেই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। এখানে বর্তমান কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতিমুক্ত কাউকে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবে, সরকার যে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে, তা কি ফাঁকা বুলি কি না।’









