বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেল। বুধবার (০৮ এপ্রিল) দুপুরে শহরের নওয়াববাড়ি সড়কে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এ অভিযোগ করেন। আবিদুর রহমান জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও বগুড়া শহর শাখার আমির।
এ ছাড়া বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা ভোট চেয়ে মিছিল করেছেন। জামায়াত প্রার্থীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে রিটার্নিং অফিসার ফজলুল করিম এ ব্যাপারে তদন্ত করতে ওই আসনে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির চেয়ারম্যান যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. আহসান হাবিবকে নির্দেশ দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের প্রার্থী অভিযোগ করেন, বিএনপি-সমর্থিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়া ও দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট লোকজনকে ভোটের দায়িত্ব দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলেও রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনও ব্যবস্থা নেননি। উল্টো রিটার্নিং কর্মকর্তাও বিএনপির প্রার্থীর পক্ষ নিয়েছেন।
আবিদুর রহমান বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী অবাধ, সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠানের আশায় উপনির্বাচনে অংশ নিলেও সরকারি দল প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচনি পরিবেশ কলুষিত ও ভীতিকর এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ দলীয় প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বারবার অভিযোগ করেও প্রতিকার মেলেনি। উল্টো বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন তিনি।’
জামায়াতের প্রার্থী বলেন, ‘ভোট গ্রহণের জন্য দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি জানানো হলেও ভোটে কারচুপি করতে বিএনপি-সমর্থিত ব্যক্তিদের প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে রিটার্নিং কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১০ দিন আগে ১৫০টি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তার তালিকা চাওয়া হলেও তিনি তালিকা গোপন করেছেন। শেষ মুহূর্তে তালিকা পাওয়ার পর দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট ১৬ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়া হলেও রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনও ব্যবস্থা নেননি।’
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নীরব থাকার অভিযোগ তুলে আবিদুর রহমান বলেন, ‘সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নার্সরা বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ধানের শীষের মিছিলে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া বগুড়া রেলস্টেশনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকের বিএনপি-সমর্থিত সিবিএ নেতাদের নেতৃত্বে ধানের শীষের পক্ষে মিছিল বের করা হয়েছে। সরকারি দলের পক্ষে চাপ দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচারণায় নামতে বাধ্য করা হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো, নির্বাচনি এলাকায় সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করার দাবি জানিয়ে বলা হয়, দাঁড়িপাল্লার কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। নির্বাচনে কালো টাকা ছড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে। এটি বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরকারি দলের তাঁবেদার না হয়ে দলনিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। সাধারণ ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগের বিষয়ে উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফজলুল করিম বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। আমরা বিষয়টি দেখছি। অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বগুড়ার অতিরিক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপনির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আছিয়া খাতুন বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে অভিযোগ পাওয়ার পর ১২ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় প্রচারণার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৬ এপ্রিল বিকালে বগুড়ার ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল চত্বর থেকে ‘জাতীয়তাবাদী চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দের’ ব্যানারে একটি মিছিল বের করা হয়। হাসপাতাল চত্বর থেকে বের হওয়া মিছিল শেরপুর রোড হয়ে শহরের সাতমাথা ঘুরে আবার হাসপাতালে গিয়ে শেষ হয়। এতে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে বিএনপি প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশার পক্ষে ভোট চেয়ে স্লোগান দেওয়া হয়।
মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীর নাম প্রকাশ্যে এসেছে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে প্রকাশ্যে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স বলেন, কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তি বদলি বা চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে তাদের মিছিলে যেতে বাধ্য করেছেন। না হয় তারা যেতেন না।
গত ৭ এপ্রিল জারি করা এক চিঠিতে উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়, সরকারি কর্মচারি আচরণ বিধিমালা-২০১৮ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী কোনও সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্বাচনের সময় কোনও প্রার্থী বা দলের পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড নির্বাচনি আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ওই চিঠিতে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির চেয়ারম্যান যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজকে নির্দেশ দিয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়।
এ ব্যাপারে বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. খুরশীদ আলম বলেন, ‘সরকারি কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন না। যদি কেউ এ রকম করে থাকেন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’









