রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে শতাধিক শিশু চিকিৎসাধীন এবং মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রচণ্ড ভিড়ে সঠিক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না রোগীরা। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা হচ্ছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৫০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। রোগীদের চাপ বাড়ায় শিশু ওয়ার্ডে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেককে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। আক্রান্তদের অনেককে আলাদা না করে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে রাখাকে ভয়ের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
যদিও হাসপাতালের মুখপাত্র জানিয়েছেন, হামের রোগীদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড ও ডেডিকেটেড কর্নারে চিকিৎসা চলছে। শিশুদের জন্য আইসিইউ শয্যা সংখ্যা খুবই সীমিত। যা অপর্যাপ্ত।
আইসিইউ সংকটে বাড়ছে মৃত্যু
কুষ্টিয়ার বাসিন্দা মো. রিফাতের পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) অপেক্ষমাণ তালিকায় তার সিরিয়াল ছিল ৩২। পরে শিশুটি মারা যায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিফাত বলেন, ‘আইসিইউতে একটি শয্যার জন্য বহু চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা করা যায়নি। আমার মেয়েটিকে শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারলাম না।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাজারামপুর গ্রামের মাহবুর রহমান ও আতিকা খাতুন দম্পতি বিয়ের চার বছর পর প্রথম সন্তানের মুখ দেখেছিলেন। কিন্তু সেই সন্তানকে তারা বাঁচাতে পারলেন না। ছয় মাস বয়সেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে সংক্রামক রোগ হামের উপসর্গ নিয়ে। মাহবুর রহমান একজন মানসিক রোগী। নিয়মিত চিকিৎসা হলে একটু ভালো থাকেন। ছেলের মৃত্যুতে এখন আতিকা খাতুন পাগলপ্রায়।
স্বজনদের কান্না ও ক্ষোভ
মাহবুর রহমানের বোন শারমিন খাতুন বলেন, ‘চেষ্টার কোনও কমতি ছিল না। গরিব মানুষ হয়েও গত কয়েকদিনে চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা খরচ করা হয়েছে। মাহবুর মানসিক রোগী বলে অনেকে সাহায্য করেছেন। কিছু ধারদেনাও হয়েছে। বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে আমাদের কোনও দুঃখ থাকতো না।’
তাদের মতো অনেক রোগীর স্বজনদের বক্তব্যে আইসিইউ সংকটের করুণ চিত্র উঠে এসেছে। একইসঙ্গে প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। যা সামাল দিতে পারছেন না হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।
জন্মের পর থেকেই ঠান্ডাজনিত রোগে ভুগছিল পাবনার বেড়া উপজেলার ইয়াকুব আলীর মেয়ে নেহা। বয়স দুই মাস। গত রোজার ঈদের দিন তার শরীরে হাম দেখা দেয়। তারপর ২৩ মার্চ রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশু বিভাগের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছিল। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক তাকে হাসপাতালের পিআইসিইউতে (পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) নেওয়ার পরামর্শ দেন। স্বজনরা দ্রুত পিআইসিইউতে গিয়ে সিরিয়াল দেন। সিরিয়াল পড়ে ১২। পিআইসিইউর জন্য অপেক্ষাধীন থাকা অবস্থায় বুধবার (০৮ এপ্রিল) দুপুরে মৃত্যু হয়।
লাশ নিয়ে মা-বাবা যখন বাড়ির পথে তখন বিকালে পিআইসিইউ থেকে নেহার মা চামেলীর মোবাইল নম্বরে কল আসে। হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, ‘পিআইসিইউ ফাঁকা হয়েছে। শিশুটি পিআইসিইউতে নিয়ে আসেন।’ এই কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে কান্না শুরু করেন মা। পরে তার কাছ থেকে ফোন নিয়ে শিশুটির বাবা হাসপাতালের লোকজনকে জানান, পিআইসিইউতে বেড না পেয়ে দুপুরেই নেহা মারা গেছে।
নেহার খালা মতিয়া খাতুন বলেন, ‘সময়মতো হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। সময়মতো পিআইসিইউতে একটা বেড পেলে হয়তো বেঁচে যেতো নেহা।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নেহাসহ চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়।
মারা যাওয়া অন্য শিশুরা হলো- কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের সুইট রানার ছেলে সামিউল (ছয় মাস), কুষ্টিয়া সদরের সাধন শেখের ছেলে সাইফান (নয় মাস) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের রাফিউল্লাহর মেয়ে তাসফিয়া (এক মাস)। তারা তিন জনই হাসপতালের পিআইসিইউতে ভর্তি ছিল।
বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ১৩২ শিশু
হাসপাতালের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৭ জন ভর্তি হয়েছে। আর সুস্থ হওয়ায় ছাড়পত্র পেয়েছে ২৪ জন। বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৩২ জন। জানুয়ারি মাসে হামের সংক্রমণ শুরুর পর এ পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ৪৭৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মার্চে শিশু আইসিইউয়ে ভর্তি ছিল ১১৯ জন। ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল ৩৮৬ শিশু। তাদের মধ্যে মারা গেছে ৯১ শিশু। একই সময়ে বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের মধ্যে ভর্তি ছিলেন ১৪৩ জন এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় ৩০২ জন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ৭০ জন। আর প্রাপ্তবয়স্ক ভর্তি ছিলেন ১৩৫ জন এবং অপেক্ষায় ছিলেন ৩১২ জন। তাদের মধ্যে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ায় শিশুদের জটিলতা দ্রুত বাড়ছে। এতে মার্চের মাঝামাঝি থেকে আইসিইউর চাহিদা বেড়ে গেছে। সময়মতো কাউকে আইসিইউ দেওয়া যাচ্ছে না।
আইসিইউ সংকটে এক মাসে ২২৯ জনের মৃত্যু, শিশু ৯১
আইসিইউ শয্যা না পেয়ে অপেক্ষায় থেকে মার্চ মাসে ২২৯ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯১ শিশু আছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০০ শয্যার নতুন আইসিইউ স্থাপনের প্রস্তাব গত রবিবার (৫ এপ্রিল) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ৪০। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ১২, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য ১৬ ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২ শয্যা বরাদ্দ। তবে বর্তমান হামের পরিস্থিতিতে অন্য জায়গা থেকে কমিয়ে শিশু আইসিইউর শয্যার সংখ্যা ছয়টি বাড়ানো হয়েছে। তাতেও সংকট কাটছে। আইসিইউ শয্যা না পেয়ে অপেক্ষায় থেকে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে।
১২টি আইসিইউ শয্যা দিয়ে কীভাবে চলবে চিকিৎসা
হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘সংকট নিরসনে অতিরিক্ত অক্সিজেন লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। শিশু আইসিইউ শয্যা আগে ১২টি থাকলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি শয্যা শুধুমাত্র হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ জনে। বর্তমানে নতুন ভর্তি হয়েছে ১৮ জন এবং চিকিৎসাধীন রয়েছে ১২৩ জন শিশু।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২০১৩ সালে এক হাজার ২০০টিতে উন্নীত করা হলেও বাস্তবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে শিশু আইসিইউতে মোট ১৮টি শয্যার মধ্যে ১২টি হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য এবং ছয়টি অন্যান্য রোগীর জন্য বরাদ্দ রয়েছে।
রাজশাহী বিভাগের বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে চাপ আরও বেড়েছে। এ অঞ্চলে শিশু আইসিইউ সুবিধা সীমিত হওয়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শয্যার চাহিদা থাকে। তবে মার্চ মাসে হঠাৎ করে হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এই চাহিদা দৈনিক প্রায় ৫০টিতে পৌঁছেছে। যা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিশু বিভাগের প্রধান সাহিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘দেশে হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সী শিশুকে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ছয় মাস বয়সী বা তার কম বয়সী শিশুদের আক্রান্তের হার বেশি। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে যত শিশু ভর্তি হয়েছে, তাদের ৬৫ শতাংশই ৯ মাসের কম বয়সী।’
সিন্ডিকেট তৈরি করে চিকিৎসাসেবা
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলে শিশুদের জন্য হাম মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। যাদের বয়স ছয় মাসেরও কম। এসব শিশুর জন্য দ্রুত সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হোক তাদের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্টভাবে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তা না হলে হামে আরও মৃত্যু বাড়বে। আমরা চাই না কোনও শিশু মারা যাক, বাবা-মায়ের কোল খালি হোক।’
রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা আগের মতো নেই উল্লেখ করে জামাত খান আরও বলেন, ‘বর্তমানে সিন্ডিকেট তৈরি করে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করা হচ্ছে। হাসপাতালে ১৫ বছর ধরে একজন চিকিৎসক আইসিইউর ইনচার্জের পদ ধরে রেখেছেন। সেখানে তো সিন্ডিকেট তৈরি হবে। বাইরে অপেক্ষামান লাশ পরিবহনেও সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এসব সিন্ডিকেট বন্ধ করতে হবে। হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা নিতে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা সরকারি হাসপাতালে সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হতে চাই না। সঠিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরতে চাই।’









