নদীর পানি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মরে ভেসে উঠছে দেশীয় প্রজাতির ছোট-বড় অসংখ্য মাছ। দলবেঁধে সেসব মাছ সংগ্রহ করছেন নদী তীরের মানুষ। দূষিত এই পানি গায়ে লাগায় হচ্ছে চুলকানিও। হঠাৎ করেই নদীর মাছে মরক দেখা দিয়েছে নাটোরের বারনই নদীতে।
নাটোরের নলডাঙ্গা থেকে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর পর্যন্ত বারনই নদীর প্রবাহ। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে মরে ভেসে ওঠা মাছ ধরতে শুরু করেন নদী পাড়ের মানুষ। কিন্তু দুর্গন্ধযুক্ত পানি গায়ে লাগার পর চুলকানি শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে কী কারণে নদীতে মাছের মোড়ক দেখা দিয়েছে, তা খতিয়ে দেখাতে এখন পর্যন্ত কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি স্থানীয় মৎস্য বিভাগের।
নদী তীরের মানুষের দাবি
বারনই নদীর প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পানি কালচে রঙ ধারণ করেছে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই। পানির ভেতর কোনও কোনও স্থানে গ্যাসের বুদবুদ দেখা গেছে। পানি দিয়ে ছড়াতে থাকে দুর্গন্ধ। সকালে নদীর পানিতে আদমরা এবং মরা অবস্থায় মাছ ভেসে উঠতে শুরু করে। মাছ ভেসে ওঠা দেখে নদীর দুই তীরে বহু মানুষ দেখার জন্য ভিড় করেন। আবার অনেকে নদীতে নেমে মরা মাছ তুলে বাড়িতে নিয়ে যান।
বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বারনই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন নাটোরের নলডাঙ্গার বাশিলা গ্রামের জেলে ভবেশ চন্দ্র। তিনি বলেন, ‘কয়দিন ধরি নদীত নামি মাছ ধরতে পারছিনি। পানিত খুব গন্ধ। পানি গায়ে লাগলে চুলকাচ্ছে। মাছও মরছে। তাই আজ (শনিবার) মাছ ধরতে যাইনি। এভাবে চললে তো সংসার চালানোই মুশকিল হয়া পড়বি।’
নলডাঙ্গা ব্রিজ ঘাটের নৌকার মাঝি হবিবর রহমান জানান, সারাদিন তিনি বারনই নদীর পানিতেই নৌকা নিয়ে থাকেন। কিন্তু দুই দিন হলো নদীর পানি দুর্গন্ধ হয়েছে। সব মাছ মরে ভেসে উঠছে। ভয়ে নদীর পানি মুখেও নিতে পারছেন না তিনি।
বর্জ্য ও রাসায়নিকমিশ্রিত পানিতে নদীদূষণ
নাটোর থেকে রাজশহী পর্যন্ত বিস্তৃত বারনই নদীটি এর আগেও দূষণের শিকার হয়েছে। নষ্ট হয়েছে পানির স্বভাবিক গুণ। মূলত রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন বর্জ্য ও রাসায়নিকমিশ্রিত দূষিত পানি খাল-নালা হয়ে বারনই নদে গিয়ে পড়ে। এ কারণে পানি পচে অক্সিজেনের মাত্রা কমে ২০২২ সালেও এই নদীতে মাছের মড়কের ঘটনা ঘটেছিল। এবার মাছের মড়ক নিয়ে সুনিদিষ্টভাবে কিছু জানা না গেলেও স্থানীয় লোকজন বিষাক্ত বর্জ্যে পানি দূষণকেই দায়ি করছেন।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, নদীর প্রাণ প্রকৃতি, মাছ-উদ্ভিদ তরুলতা এবং নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততার কথা চিন্তা না করে হরহামেশাই ইচ্ছামতো বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হয়। ফেলা হয় চিনিকলের বর্জ্যও। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে নদীর পানি দূষণ করে পরিবেশ নষ্ট করা হলেও প্রশাসনিকভাবে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে নদী দূষণও বন্ধ হয় না।
জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করে জাতীয় পুরস্কার লাভ করা নলডাঙ্গার তরুণ ফজলে বলেন, বারনই নদীতে আগেও পানি পচে দুর্গন্ধ হয়েছিল। মাছেও মড়ক দেখা দিয়েছিল। কিন্তু কেন মাছ মরেছিল তার কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কোনও আগ্রহ নেই।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
নলডাঙ্গা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু সাঈদের ভাষ্য, পাট পচানোর বর্জ্য নদীর পানিতে দূষণ সৃষ্টি করতে পারে। এতে করে নদীর পানিতে অতিমাত্রায় গ্যাস হতে পারে। এ ছাড়া রাজশাহী নগরী ও শিল্পকারখানার রাসায়নিকবর্জ্য মিশে বারনই নদীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে মাছে মড়ক দেখা দিতে পারে। নদীর মাছ মরে ভেসে ওঠার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে এখনও কোনও নির্দেশনা পাননি তিনি।
নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওমর আলী বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে তাহেরপুর এলাকার পোলট্রিখামারের বর্জ্য ও রাজশাহী সিটির বর্জ্য এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার মাধ্যমে পানি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করবো। আমাদের পরীক্ষা–নিরীক্ষার মেডিসিন নেই, যন্ত্রপাতিও নষ্ট। কয়েক দিন মানুষকে নদীর পানি ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।









