শিক্ষক সংকটে ভুগছে নাটোরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি সংকট রয়েছে সহকারী শিক্ষক পদেও। এতে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজেও প্রভাব পড়ছে। দেখা দিচ্ছে নানামুখী জটিলতা। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনের দাবি থাকলেও সরকারিভাবে বাস্তবভিত্তিক কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট থাকায় দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনেক শিক্ষক অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে গিয়ে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
নাটোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী, জেলার সাতটি উপজেলার ১৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে গুরুদাসপুরে ১৮টি, নাটোর সদরে ২৯টি, বড়াইগ্রামে ১৯টি, বাগাতিপাড়ায় ১১টি, লালপুরে ২২টি, সিংড়ায় ৪২টি এবং নলডাঙ্গায় ১৪টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদ শূন্য থাকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা সিংড়া উপজেলাতেই বেশি। এর পাশাপাশি নাটোর জেলাজুড়ে সহকারী শিক্ষকের ৩০৩টি পদও শূন্য রয়েছে।
শিক্ষকদের দাবি, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মিলিয়ে মোট ৪৪৯টি পদ ফাঁকা পড়ে আছে। ফলে অতিরিক্ত পাঠদানের পাশাপাশি নানামুখী জটিলতায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। অথচ শিক্ষক সংকট নিরসনে সরকারের তেমন কোনও উদ্যোগ নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক সংকটে থাকা ১৪৬টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে একই সঙ্গে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম, সরকারি চিঠিপত্র, অনলাইনে তথ্য প্রদান, শিক্ষক সমন্বয় এবং শিক্ষা অফিসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা বলেন, একই পদে থেকে সহকারী শিক্ষকদের বিভিন্ন কাজে নির্দেশ দিতে গিয়ে অনেক সময় দ্বিধায় পড়তে হয়। এ ছাড়া পাঠদান, প্রাতিষ্ঠানিক সভা ও দাফতরিক কাজ করতে গিয়ে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।
নাটোর শহরের ফুলবাগান মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দীপংকর কুমার দত্ত বলেন, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছেন। সহকারী শিক্ষক হয়েও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রম সামাল দিতে হচ্ছে। কখনও কখনও প্রশাসনিক কাজের তাগিদে বিদ্যালয়ের বাইরে যেতে হলে পাঠদান ব্যাহত হয়। এসব সংকট দূর করতে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের দাবি জানান তিনি।
বিদ্যালয় পরিচালনা করতে গিয়ে একই ধরনের সমস্যায় পড়ার কথা জানালেন নাটোর উপরবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিলরুবা আক্তার। তার ভাষ্যমতে, সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত দায়িত্ব অনুযায়ী পাঠদান করতে হয়। আবার প্রধান শিক্ষকের নিত্যদিনের সব কাজও তাকেই করতে হয়। অথচ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও এ জন্য তাদের কোনও অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয় না। এই কষ্ট লাঘবে শিক্ষকদের পদোন্নতি ও দ্রুত নতুন নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
মছিরেন নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সালমা সুলতানা আক্ষেপ করে বলেন, তাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। এখনও পদটি পূরণ করা হয়নি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একসঙ্গে অতিরিক্ত কাজের চাপ সামলাতে হচ্ছে তাকে। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি।
ফুলবাগান মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মৌসুমী জেসমিনসহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের অন্তত ১৫ জন শিক্ষক বলেন, এমনিতেই প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের সংকট রয়েছে। ফলে রুটিন দায়িত্বের বাইরেও অতিরিক্ত পাঠদান করাতে হচ্ছে সহকারী শিক্ষকদের। শ্রেণি পরীক্ষার দায়িত্বও তাদের মধ্যে ভাগ করে নিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত কাজের চাপে অনেক সময় শিক্ষকদের ধৈর্য ধরে দায়িত্ব পালন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সায়েম হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও রিতি খাতুনসহ কয়েকজন অভিভাবক জানান, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় করাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনাও। তাই প্রাথমিক শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের দাবি জানান তারা।
প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার কথা নিশ্চিত করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন, পাঠদান, শ্রেণি পরীক্ষাসহ নানা ধরনের কাজ একসঙ্গে করতে গিয়ে সহকারী শিক্ষকরা হিমশিম খাচ্ছেন। জরুরি ভিত্তিতে এসব শূন্য পদ পূরণ করা গেলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাই প্রাথমিক শিক্ষার মান বিবেচনায় শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের দাবি জানান তিনিও।