‘শিক্ষকেরা স্মৃতির নয়, জীবনের অংশ হয়েছেন’

আব্দুন নূর তুষার
০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩০ আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩০

শিক্ষক দিবস মূলত একটি পশ্চিমা ধারণা। আমাদের প্রাচ্যে আমরা প্রতিদিনই শিক্ষকদের স্মরণ করি। কারণ আমাদের জীবনে শিক্ষক শুধু পিতা-মাতার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষই নন, শিক্ষককে আমরা পরম শ্রদ্ধার মানুষ হিসেবেও দেখি। কবিতায় পড়েছি, বাদশা আলমগীর তাঁর সন্তানকে বলেছিলেন শিক্ষকের পা ধুয়ে দিতে। আমার নিজের জীবনের দিকে তাকালে বুঝতে পারি, আমার বহু শিক্ষক, বহু মানুষ আমাকে নানা সময়ে নানা কিছু শিখিয়েছেন। তাই আলাদা করে কোনো একজন শিক্ষকের কথা বলতে চাই না। প্রতিটি শিক্ষকের সঙ্গে আমার আলাদা আলাদা অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। একজনকে অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া আমার কাছে ঠিক মনে হয় না।

যে স্কুলে পড়েছি, সেখানেই কলেজও ছিল। জীবনের ১২ বছর আমি একদল শিক্ষকের যত্নে ছিলাম। তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্নভাবে আমাকে হাতে ধরে শিখিয়েছেন। প্রত্যেক শিক্ষকই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লাইব্রেরিয়ান শিক্ষক ছিলেন শিলব্রত চৌধুরী। তাঁর কাছেই আমি বই পড়া শিখেছি। শরীরচর্চার শিক্ষক ছিলেন আব্দুস সালাম, আমজাদ হোসেন ও আবু তাহের। তাঁরা নানাভাবে আমাদের শরীরচর্চা শিখিয়েছেন। আব্দুস সালাম ছিলেন জাতীয় দলের ক্রিকেট ও হকি কোচ। তাঁর কাছ থেকে আমরা প্রায় জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মতোই যত্ন পেতাম।

আমার শিক্ষক ছিলেন লোকমান স্যার, হেমায়েতউদ্দিন স্যার ও আব্দুল মান্নান স্যার। তাঁরা আমাদের বাংলা ও আরবি শিখিয়েছেন। একই সঙ্গে শিখিয়েছেন ধর্ম যে কত সুন্দর, ধর্ম যে কত উদার। আমার বাংলা শিক্ষক ছিলেন একাধিক। আব্দুর রাজ্জাক স্যার ও আব্দুল মান্নান স্যার আমার বাংলা খাতা আলাদা করে রেখে দিতেন। কোন জায়গাগুলো বেশি সুন্দর হয়েছে, তা বুঝিয়ে বলতেন। এমনও হয়েছে, আব্দুর রাজ্জাক স্যার আমার খাতা ক্লাসে পড়ে শুনিয়েছেন। ইংরেজির শিক্ষকরাও ছিলেন তেমনই। শহিদুল ইসলাম স্যার ও ইরশাদ আহমেদ শাহিন ছোটবেলায় আমাকে ইংরেজি শিখিয়েছেন।

আমাদের ক্লাস ওয়ানের ক্লাস টিচারকে আমরা মনসুর টিচার বলতাম। তিনি আমাকে হাতে ধরে বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা শিখিয়েছেন, পড়তে শিখিয়েছেন। সুন্দর উচ্চারণে বাংলা ও ইংরেজি পড়তে এবং বলতে হয়, সেটিও তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি। ক্লাস টু, থ্রি, ফোরের যতজন ক্লাস টিচার ছিলেন, তাঁরাও একইভাবে যত্ন নিয়ে আমাদের পড়াতেন। হাসনা ম্যাডাম, দিলারা ম্যাডাম; তাঁরা যেন নিজেদের সন্তানকে পড়াচ্ছেন, এমন যত্ন করতেন। ভূগোল শিখেছি রেজাউল ইসলাম স্যারের কাছে। ফিজিক্স শিখেছি রউফ স্যার ও জব্বার স্যারের কাছে। অংক শিখেছি সাব্বির স্যার থেকে শুরু করে শামসুল হক স্যার পর্যন্ত।

এখন যখন এসব নাম একসঙ্গে মনে করি, তখন বুঝতে পারি, প্রত্যেকের সঙ্গে আমার আলাদা একটি গল্প আছে। কারও কাছ থেকে বই পড়া শিখেছি, কারও কাছ থেকে শরীরচর্চা, কারও কাছ থেকে ভাষা, কারও কাছ থেকে ধর্মের উদারতা, আবার কারও কাছ থেকে কোনো বিষয়কে সুন্দরভাবে বোঝার শিক্ষা পেয়েছি। তাই তাঁদের কাউকেই আলাদা করে ছোট বা বড় করে দেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

স্কুলের বাইরেও আমার শিক্ষক ছিলেন। আব্দুল্লাহ আবু সাঈদের কাছ থেকে আমি সাহিত্য বুঝতে শিখেছি। আরও গভীরভাবে পড়তে শিখেছি। জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর সেই পরামর্শ অনেক সময় কাজে লেগেছে। সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে ধৈর্য ও সহনশীলতার বিষয়টি। তিনি সবসময় এ দুটির কথা বলতেন।

টেলিভিশনের অনুষ্ঠান নির্মাণ শিখেছি দুজন মানুষের কাছ থেকে। একজন মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের ডিজি ছিলেন। আরেকজন মুস্তাফা কামাল সৈয়দ। তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন, অনুষ্ঠানে কোন বিষয়গুলো বর্জনীয়, কোন বিষয়গুলো দেওয়া উচিত নয়। তিনি বুঝিয়েছিলেন, সবকিছু পাবলিক স্ফিয়ারে করতে হয় না।

মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব আমাকে একেবারে হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন কীভাবে শিল্পী নির্বাচন করতে হয়, একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে কোন বিষয়গুলো আগে করতে হয়, কীভাবে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের মধ্যে সাক্ষাৎকার কিংবা কুইজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সিংক করা যায়। আনিসুল হক ছিলেন উপস্থাপক। তাঁর কাছ থেকে আমি শোম্যানশিপ শিখেছি। অনুষ্ঠান যেমনই হোক, তিনি নিজের প্রতি খুব যত্নবান থাকতেন। নিজের পোশাক, চশমা থেকে শুরু করে জুতো; সবকিছু পরিপাটি রাখতেন। প্রতিটি কথা বারবার শেখার চেষ্টা করতেন। আমি লিখে উপস্থাপনা করি না। কিন্তু বহু বছর তাঁর জন্য লিখেছি। আর সেই লেখা লিখতে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি; কোনটা লেখা উচিত, কোনটা উচিত নয়। কারণ তাঁর পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় তাঁর উপস্থাপনার লেখা তৈরি করে দিতাম।

আরেকজনের কাছ থেকে শিখেছি, টেলিভিশন একটি ব্যবসাও হতে পারে। সৃজনশীল কাজ একই সঙ্গে ব্যবসা ও পেশা হতে পারে; এটি শিখেছি ফরিদুর রেজা সাগরের কাছ থেকে। এ রকম অনেক মানুষের কাছ থেকেই আমি অনেক কিছু শিখেছি। তাই জীবনে শুধু একজনকে শিক্ষক বললে ভুল হবে। আমরা আসলে জীবনের পাঠশালায় বহু মানুষের কাছ থেকে বহু কিছু শিখেছি।

আমার ছোটবেলার একটি স্মৃতি এখনো মনে আছে। একজন রিকশাওয়ালা আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। পরীক্ষার সময় কেন যেন তিনি প্রতিদিন আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। ফেরার সময় আমার প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে নানা প্রশ্ন করতেন। পরে শুনেছিলাম, তিনি বহু বছর আগে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। খুব ভালো ইংরেজি জানতেন, অনুবাদ করতে পারতেন। 

এখন আর তাঁর সঙ্গে দেখা হয় না। কিন্তু একটা সময় আমি নিজেই অপেক্ষা করতাম, কখন তিনি পরীক্ষার পর আমাকে নিতে আসবেন। তিনি সত্যিই আমাকে নিতে আসতেন। এটা হয়তো এখন কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, সেই রিকশাওয়ালার কাছ থেকেও আমি কিছুটা ইংরেজি শিখেছি; আমি সেটিই বলবো।

আমার দাদাও স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি গ্রামের স্কুলে পড়াতেন। তিনিও আমাকে অনেক ভালো ইংরেজি শিখিয়েছেন। তখন এমন দূরের গ্রামের স্কুলেও ভালো ইংরেজি জানা শিক্ষক থাকতেন, যেটা এখন পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে গেছে। শিক্ষকদের সম্পর্কে আমি ছোট করে শুধু এটুকুই বলতে চাই; আমার জীবনে শিক্ষকরা যে আমার স্মৃতির অংশ হয়েছেন, আসলে তাঁরা শুধু আমার স্মৃতির অংশ হননি। তাঁরা আমার জীবনের অংশ হয়েছেন।

আজ আমি যা কিছু ভালো, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু নির্ভুলভাবে করি, তার পেছনে আমার শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা আছে। আজকের এই শিক্ষক দিবসে জীবনে যার কাছ থেকে যতটুকু শিখেছি, অল্প কিংবা বেশি, সবই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক আপনার সঙ্গে বেশি সময় থাকলে হয়তো তাঁর সঙ্গে আপনার বেশি স্মৃতি তৈরি হবে। কিন্তু তাই বলে অন্য কোনো শিক্ষক গুরুত্বহীন হয়ে যান না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি জায়গায়, প্রতিটি স্থানে কেউ না কেউ আমাদের পাশে শিক্ষকের ভূমিকায় আসেন।

আমার জীবনে যতজন মানুষ এভাবে শিক্ষকের ভূমিকায় এসেছেন, আমি তাঁদের সকলকে অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই। আর আমি এতটুকুই বলতে পারি; আমি আমার মধ্যে যতটুকু ভালো পাই, কিংবা আপনারা আমার মধ্যে যতটুকু ভালো দেখেন, এই ভালোটুকুর কিছুই আমার একার নয়। এর অধিকাংশ আমার বাবা-মা, আমার পরিবার এবং আমার শিক্ষকদের। আমার শিক্ষকদের প্রতি আমি অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা জানাই।

—গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক

/ইউএস/
সম্পর্কিত
‘লিয়াকত স্যারকে খুব ফিল করি, কোথায় আছেন কেমন আছেন জানি না’
কেন বারবার শিক্ষকরা রাজপথে নামেন?
‘শিষ্টাচার শেখার ক্ষেত্রে আমার শিক্ষকদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য’
সর্বশেষ খবর
বয়স হলেই বিয়ে করতে হবে, মানতে নারাজ কৌশানি
বয়স হলেই বিয়ে করতে হবে, মানতে নারাজ কৌশানি
‘লিয়াকত স্যারকে খুব ফিল করি, কোথায় আছেন কেমন আছেন জানি না’
‘লিয়াকত স্যারকে খুব ফিল করি, কোথায় আছেন কেমন আছেন জানি না’
এশিয়ার ফুটবলে আসছে বড় পরিবর্তন, বদলে যেতে পারে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের কাঠামো!
এশিয়ার ফুটবলে আসছে বড় পরিবর্তন, বদলে যেতে পারে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের কাঠামো!
আইএমএফের নতুন ঋণ পেতে বাংলাদেশের সামনে ৪ কঠিন শর্ত
আইএমএফের নতুন ঋণ পেতে বাংলাদেশের সামনে ৪ কঠিন শর্ত
সর্বাধিক পঠিত
২০২৭ সালে স্বর্ণের দাম নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট ও বাবা ভাঙ্গার পূর্বাভাসে কী আছে?
২০২৭ সালে স্বর্ণের দাম নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট ও বাবা ভাঙ্গার পূর্বাভাসে কী আছে?
অসুস্থতায় ৯ মাস শুটিংয়ে নেই, এবার ফিরতে চান তানিয়া বৃষ্টি
অসুস্থতায় ৯ মাস শুটিংয়ে নেই, এবার ফিরতে চান তানিয়া বৃষ্টি
গ্রেফতার এড়াতে লিঙ্গ পরিবর্তন, ৮ বছর পর ধরা পড়লেন পলাতক আসামি
গ্রেফতার এড়াতে লিঙ্গ পরিবর্তন, ৮ বছর পর ধরা পড়লেন পলাতক আসামি
বিচ্ছেদের ঘোষণা প্রীতম ও শেহতাজের
বিচ্ছেদের ঘোষণা প্রীতম ও শেহতাজের
২৫০ কোটি ডলারের স্টেডিয়াম নির্মাণ স্থগিত করলো সৌদি আরব
২৫০ কোটি ডলারের স্টেডিয়াম নির্মাণ স্থগিত করলো সৌদি আরব