রাজশাহীর দুর্গাপুরের মাঠে এবার দেখা মিলেছে ব্যতিক্রমী এক ধানের। প্রচলিত সোনালী ধানের পাশাপাশি জমিতে দুলছে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ‘ব্ল্যাক রাইস’ বা কালো ধান। উপজেলাটিতে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে এ ধানের চাষ।
সাধারণ ধানের তুলনায় বাজারে বেশি দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় নতুন এ ফসল ঘিরে আশাবাদী কৃষক ও কৃষি বিভাগ। ফলন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে কালো ধান হতে পারে স্থানীয় কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুর পৌরসভার দেবীপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সোহান ১৬ কাঠা জমিতে এবং মাড়িয়া ইউনিয়নের পালি গ্রামের কৃষক আবু তালেব প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে কালো ধানের আবাদ করেছেন। নতুন এ ফসলের চাষাবাদ, পরিচর্যা ও ফলন বাড়াতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
কৃষক আবু তালেব বলেন, ‘ব্ল্যাক রাইস আমাদের এলাকায় একেবারেই নতুন। তাই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে আড়াই বিঘা জমিতে চাষ করেছি। ফলন ভালো হলে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে লাভবান হতে পারবো। এ উদ্যোগ সফল হলে আশপাশের অন্য কৃষক এ ধান চাষে আগ্রহী হবেন।’
কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘায় ১৬ থেকে ১৮ মণ ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি মণ ধানের সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ৪ হাজার টাকা ধরা হলে বিঘাপ্রতি মোট বিক্রি হতে পারে ৬৪ থেকে ৭২ হাজার টাকা। তবে এটি সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য, নিট মুনাফা নয়। বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক ও অন্যান্য উৎপাদন খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত লাভ নির্ধারিত হবে। পাশাপাশি উৎপাদিত ধানের জন্য নিশ্চিত ক্রেতা ও উপযুক্ত বাজার তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, কালো চালে অ্যান্থোসায়ানিন নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রঞ্জক উপাদান থাকায় এর রং কালো বা গাঢ় বেগুনি হয়। খাদ্য-আঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতির কারণে স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের কাছে এ চালের আলাদা চাহিদা রয়েছে। তবে বেশি দামের সম্ভাবনা থাকলেই যে চাষ লাভজনক হবে, তা নিশ্চিত নয়। উৎপাদন ব্যয়, ফলনের স্থিতিশীলতা, চালের গুণগত মান এবং বাজারজাতকরণব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করবে এর বাণিজ্যিক সাফল্য।
পৌরসভা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ এবং পালি ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুমিনুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে জমিতে ধানের পরিচর্যা করা হচ্ছে। দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, ‘দুর্গাপুরে প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক রাইসের আবাদ কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। নতুন ও সম্ভাবনাময় ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। এবারের ফলন, উৎপাদন খরচ ও বাজারের চাহিদা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে আবাদের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষিতে একসময় বর্ষানির্ভর আউশ ও আমন ধানের প্রাধান্য ছিল। বরেন্দ্র অঞ্চলে গভীর নলকূপ ও আধুনিক সেচব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে বোরো ধানের আবাদও বেড়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রচলিত ধানের বাইরে নতুন জাতের পরীক্ষামূলক আবাদে যুক্ত হয়েছে দুর্গাপুর। সংশ্লিষ্টদের আশা, অনুকূল আবহাওয়া, সন্তোষজনক ফলন ও ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কালো ধানের চাষ ভবিষ্যতে কৃষকদের আয়ের নতুন পথ খুলে দিতে পারে। তবে পরীক্ষামূলক আবাদ থেকে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে যেতে হলে ফলন ও লাভের বাস্তব হিসাবের পাশাপাশি বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।