কৃত্রিম বন তৈরির নতুন পদ্ধতি মিয়াওয়াকি, বরেন্দ্রের লাল মাটিতে সোহেলের চমক

রাজশাহী প্রতিনিধি
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৩ আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৩

একসময় উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে চোখে পড়তো ঝোপঝাড় আর ঘন বনাঞ্চল। সময়ের সঙ্গে কৃষিজমি সম্প্রসারণ, সড়ক নির্মাণ, শিল্পকারখানা ও বসতবাড়ি গড়ে ওঠায় কমেছে গাছপালা। সংকুচিত হয়েছে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। এমন পরিস্থিতিতে বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক লাল মাটিতে দেশি গাছের সমাহারে কৃত্রিম বন গড়ে তুলেছেন জাতীয় যুব পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা। নওগাঁর সাপাহার উপজেলা সদরে তার ‘বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে’ গড়ে তোলা হয়েছে মিয়াওয়াকি পদ্ধতির বন। উদ্যোক্তার দাবি, বিলুপ্তপ্রায় ও দেশি প্রজাতির গাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি এ উদ্যোগ পরিবেশ সুরক্ষা ও কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনাঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রচলিত হিসাবে, একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন বলে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। তবে বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ এ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। বিশেষ করে রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে বনাঞ্চলের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। এমন বাস্তবতায় ব্যক্তি উদ্যোগে বরেন্দ্র অঞ্চলে বন সৃষ্টির এ প্রচেষ্টা নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

সাপাহার উপজেলা সদরের গোডাউনপাড়া এলাকায় প্রায় ১৫০ বিঘা জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক। এরই একটি অংশে প্রায় ৫৫ শতাংশ জমিতে তৈরি করা হয়েছে মিয়াওয়াকি বন। সোহেল রানার উদ্যোগে সেখানে দেশি, ফলদ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধকসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় দুই হাজার ৭০০ গাছ ও লতাগুল্ম রোপণ করা হয়েছে। উদ্যোক্তার দাবি, এসবের মধ্যে রয়েছে এ অঞ্চলে বিলুপ্তপ্রায় পাঁচ শতাধিক প্রজাতির গাছ ও লতাগুল্ম।

উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার মধ্যে এটিই প্রথম মিয়াওয়াকি বন বলে দাবি করছেন উদ্যোক্তা। গাছের প্রজাতির বৈচিত্র্যের বিবেচনায় এটিকে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ মিয়াওয়াকি বন হিসেবেও উল্লেখ করছেন তিনি। এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের পাশাপাশি বাঁশ, শোভাবর্ধক এবং বিপন্ন ও সংরক্ষণযোগ্য উদ্ভিদ।

তবে এমন বন গড়ে তোলা সহজ ছিল না। জমি প্রস্তুত, মাটির গুণাগুণ বিবেচনা, জৈব সার প্রয়োগ, চারা সংগ্রহ, বাঁশের খুঁটি স্থাপন ও মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে জৈব মালচিংয়ের মতো নানা কাজ করতে হয়েছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টা, শ্রম ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন এ বন।

সোহেল রানা উচ্চশিক্ষিত একজন কৃষি উদ্যোক্তা। ২০০৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর ঢাকায় প্রায় ছয় বছর সাংবাদিকতা করেন। পরে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নিজ জেলা নওগাঁয় ফিরে আসেন। গড়ে তোলেন বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক।

সোহেল রানা বলেন, মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে দেশের প্রথম কৃত্রিম বন তৈরি করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মধ্যে আমিই প্রথম এ উদ্যোগ নিয়েছি। এর মাধ্যমে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তার দাবি, প্রচলিত বনায়নের তুলনায় মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে। এ পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় ঘন বন তৈরি করা সম্ভব। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ একসঙ্গে বেড়ে ওঠায় সেখানে জীববৈচিত্র্যের বিকাশেরও সুযোগ তৈরি হয়।

মিয়াওয়াকি মূলত বনায়নের একটি পদ্ধতি। জাপানি উদ্ভিদবিদ ও উদ্ভিদ বাস্তুবিদ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আকিরা মিয়াওয়াকির উদ্ভাবিত এ পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট এলাকার প্রাকৃতিক উদ্ভিদবৈচিত্র্য বিবেচনা করে স্থানীয় প্রজাতির গাছ ঘনভাবে রোপণ করা হয়। মাটির গুণাগুণ উন্নয়ন, জৈব উপাদান যোগ এবং উপযুক্ত প্রজাতি নির্বাচন এ পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এ পদ্ধতির লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে কম জায়গায় ঘন ও বৈচিত্র্যময় বন গড়ে তোলা। যথাযথ পরিচর্যা ও অনুকূল পরিবেশ পেলে এসব গাছ দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে পাখি, কীটপতঙ্গসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাস ও খাদ্যের সংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে এ ধরনের বন।

উদ্ভিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক গবেষক মোকারম হোসেন বলেন, দেশের বনাঞ্চল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বরেন্দ্র অঞ্চল শুষ্ক হওয়ায় এখানে বন সৃষ্টির ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে দেশি ও বিলুপ্তপ্রায় গাছের সমন্বয়ে ঘন বন গড়ে তোলা সম্ভব।

তিনি বলেন, যেসব ফাঁকা জায়গায় আগে ঝোপঝাড় বা দেশি গাছপালা ছিল, সেগুলো কাজে লাগানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মিয়াওয়াকি পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বনাঞ্চল গড়ে উঠলে মানুষ, পাখি ও কীটপতঙ্গের খাদ্যের সংস্থান বাড়বে। একই সঙ্গে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও সহায়ক হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ মনজুর হোসেন বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বন গড়ে তোলা কিছুটা কঠিন। কারণ, এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম। তবে পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নিলে তা সম্ভব।

তার মতে, এ ধরনের বন গড়ে উঠলে গাছের সংখ্যা বাড়বে, কার্বন শোষণে সহায়তা করবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। তবে বৃষ্টিপাত বাড়ানো বা শুষ্কতা কমানোর মতো প্রভাব নির্ভর করবে বনভূমির বিস্তৃতি, গাছের প্রজাতি, পরিচর্যা ও স্থানীয় পরিবেশগত অবস্থার ওপর।

পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি মিয়াওয়াকি বনকে ঘিরে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে আয়ের সম্ভাবনাও দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নিজেদের বৃদ্ধি ও জৈব পদার্থ তৈরিতে ব্যবহার করে। ফলে পরিকল্পিত বনায়ন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।

কার্বন ক্রেডিট নিয়ে কাজ করছে সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন (সাফ) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটি উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফরহানুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কৃষকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টিতে কৃত্রিম বনভিত্তিক কার্বন ক্রেডিট প্রকল্প বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। বিশেষ করে উত্তরের উৎপাদনসমৃদ্ধ অঞ্চলে এ ধরনের প্রকল্প টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও জলবায়ু অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

সোহেল রানাও মনে করেন, মিয়াওয়াকি বন ভবিষ্যতে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তার ভাষায়, মিয়াওয়াকি বন শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধির মাধ্যম নয়, এটি ভবিষ্যতে কার্বন ক্রেডিট বিক্রিরও একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এ বনের গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পেলে কার্বন শোষণের পরিমাণও বাড়তে পারে। ফলে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে আয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে আয় করতে হলে বনভূমিতে কার্বন শোষণের পরিমাণ নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে পরিমাপ, স্বীকৃত মানদণ্ডে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট বাজারের নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। শুধু গাছ লাগালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্বন ক্রেডিট বিক্রির সুযোগ তৈরি হয় না।

বরেন্দ্র এগ্রো পার্কের মিয়াওয়াকি বনকে শুধু বনায়ন প্রকল্প হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না সোহেল রানা। তার পরিকল্পনা, এটি হবে গাছ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার একটি উন্মুক্ত শিক্ষাকেন্দ্র। ছুটির দিনে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের এখানে এনে দেশি ও বিলুপ্তপ্রায় গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চান তিনি।

পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের কৃষি উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক কৃষকদের মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বন তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তার। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে দেশি প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ, পরিবেশের উন্নয়ন এবং কৃষকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটিতে গড়ে ওঠা এ বন তাই কেবল কয়েক হাজার গাছের সমষ্টি নয়; এটি দেশি উদ্ভিদ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের একটি উদ্যোগ। যথাযথ পরিচর্যা, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটলে এ ধরনের উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলে বনায়নের নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

/আরএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সন্তানের পাশের রুমেই পড়ে ছিলো মায়ের মরদেহ, দুর্গন্ধ ছড়ালে উদ্ধার করে পুলিশ
সন্তানের পাশের রুমেই পড়ে ছিলো মায়ের মরদেহ, দুর্গন্ধ ছড়ালে উদ্ধার করে পুলিশ
ভূমিমন্ত্রী মিনুকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি
ভূমিমন্ত্রী মিনুকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি
‘মানুষ হত্যায় স্টারলিংক ব্যবহার করেছে ইউক্রেন’, অভিযোগ মাস্কের
‘মানুষ হত্যায় স্টারলিংক ব্যবহার করেছে ইউক্রেন’, অভিযোগ মাস্কের
কোজাগরী পূর্ণিমা, প্যাঁচা আর হারিয়ে যাওয়া সমৃদ্ধির গল্প
কোজাগরী পূর্ণিমা, প্যাঁচা আর হারিয়ে যাওয়া সমৃদ্ধির গল্প
সর্বাধিক পঠিত
পূজার ছুটি শেষে ফিরে দেখেন বাসায় রাখা অর্ধকোটি টাকা আর ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নেই
পূজার ছুটি শেষে ফিরে দেখেন বাসায় রাখা অর্ধকোটি টাকা আর ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নেই
‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ইউএনও’ ফেসবুকে সহকারী কমিশনারের পোস্ট
‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ইউএনও’ ফেসবুকে সহকারী কমিশনারের পোস্ট
লাখ লাখ টাকার মাঝে মিললো এক চিঠি, যা লিখলেন তারেক রহমানকে
লাখ লাখ টাকার মাঝে মিললো এক চিঠি, যা লিখলেন তারেক রহমানকে
‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত, তথ্যপ্রমাণ সামনে এনেছে বিএনপি’
‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত, তথ্যপ্রমাণ সামনে এনেছে বিএনপি’
সাইবার হামলার ঝুঁকিতে ছয় ব্যাংকসহ যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বন্ধ
সাইবার হামলার ঝুঁকিতে ছয় ব্যাংকসহ যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বন্ধ