কোজাগরী পূর্ণিমা, প্যাঁচা আর হারিয়ে যাওয়া সমৃদ্ধির গল্প

চিররঞ্জন সরকার
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

শারদীয় দুর্গাপূজার ঢাকের শব্দ স্তিমিত হতে না হতেই বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে শুরু হয় আরেক দেবীর আরাধনা, মা লক্ষ্মীর পূজা। প্রতি বৃহস্পতিবারের ঘরোয়া ব্রত থেকে শুরু করে আশ্বিনের পূর্ণিমায় জাঁকজমকপূর্ণ কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা; বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে লক্ষ্মীর উপস্থিতি চিরচেনা। তিনি ধনসম্পদের দেবী, সৌভাগ্যের প্রতীক, সংসারের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা। তবে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক বিশ্বাস, যার মধ্যে ধর্মীয় আচার, লোককথা আর বাঙালির কল্পনাপ্রবণ মন একাকার হয়ে গেছে।

শরতের পূর্ণিমা। আকাশজুড়ে ঝলমলে চাঁদ, চারদিকে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না। প্রচলিত বিশ্বাস, বছরের এই বিশেষ রাতে ধনসম্পদ, সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে নেমে আসেন। ঘরে ঘরে ঘুরে তিনি খোঁজ করেন—কে জেগে আছে? সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’ কথাটির অর্থই হলো, ‘কে জেগে আছে?’ সেখান থেকেই ‘কোজাগরী’ শব্দের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। লোকবিশ্বাসে, এই রাতে যে জেগে থেকে দেবীর আরাধনা করে, তার ওপরই প্রসন্ন হন লক্ষ্মী। অর্থাৎ ঘুমিয়ে থাকলে লক্ষ্মীর কৃপা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা, আর জেগে থাকলে ভাগ্যের দরজা খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা! 

বাঙালির কাছে তাই কোজাগরী পূর্ণিমা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি রাত জেগে সৌভাগ্যের অপেক্ষায় থাকারও এক চিরকালীন উপলক্ষ।

বাঙালি হিন্দুর লোকবিশ্বাসে লক্ষ্মী শিব-দুর্গার কন্যা, সরস্বতী তাঁর বোন, আর কার্তিক ও গণেশ তাঁর ভাই। আবার পুরাণের অন্য বয়ানে তিনি বিষ্ণুর সহধর্মিণী। কোথাও তিনি সৌন্দর্যের দেবী, কোথাও ধনসম্পদের অধিষ্ঠাত্রী, কোথাও বা শস্য ও প্রাচুর্যের প্রতীক। তাঁকে ঘিরে কাহিনিরও অভাব নেই। দেবীকে নিয়ে পুরাণে যত মতভেদই থাকুক, গৃহস্থের কাছে তাঁর পরিচয় মোটামুটি একটাই—সংসারে অভাব যেন না থাকে, গোলাভরা ধান আর ভান্ডারভরা সম্পদ যেন অটুট থাকে, পরিবারে যেন সুখ ও শান্তি বিরাজ করে। দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার মধ্যে তাই ধর্মবিশ্বাসের পাশাপাশি মিশে আছে মানুষের চিরন্তন নিরাপত্তা ও ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা।

লক্ষ্মীপূজার প্রস্তুতি শুরু হয় ঘরদোর পরিষ্কার করা, পূজার উপকরণ জোগাড় করা আর আলপনা আঁকার মধ্য দিয়ে। আলপনা শুধু মেঝে সাজানোর শিল্প নয়; এটি বাঙালির লোকসংস্কৃতির এক প্রাচীন ভাষা। ‘আলপনা’ শব্দটির উৎস হিসেবে সংস্কৃত ‘আলিম্পন’ শব্দের উল্লেখ করা হয়, যার অর্থ প্রলেপ দেওয়া বা লেপন করা। একসময় পূজার আগের দিন আতপ চাল ভিজিয়ে রাখা হতো। পরদিন সেই চাল পিষে তৈরি করা হতো সাদা পিটুলি। এক টুকরো কাপড় বা আঙুলের সাহায্যে মেঝেতে ফুটে উঠত লতাপাতা, ফুল, শস্যের শিষ আর নানা মঙ্গলচিহ্ন। আধুনিক রং ও নকশার উপকরণ এসে সেই প্রথায় কিছু পরিবর্তন আনলেও চালের গুঁড়োয় আঁকা সাদামাটা আলপনার ঐতিহ্য আজও বহু বাড়িতে অমলিন।

লক্ষ্মীপূজার আলপনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ দেবীর পায়ের ছাপ। সদর দরজা থেকে ঘরের ভেতর পর্যন্ত ছোট ছোট পায়ের চিহ্ন এঁকে রাখা হয়, যেন মা লক্ষ্মী বাইরে থেকে ঘরে প্রবেশ করছেন। দেবীর পা ঘরের ভেতরের দিকে মুখ করে আঁকার মধ্যে রয়েছে এক সহজ অথচ গভীর প্রত্যাশা—লক্ষ্মী যেন ঘরে আসেন, ঘর ছেড়ে চলে না যান। গৃহস্থের কাছে এই পায়ের ছাপ আসলে ধনাগম, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক। দেবী চঞ্চলা—এই প্রচলিত ধারণা থেকেই তাঁকে ঘরে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা। যেন একবার প্রবেশ করলেই তিনি আর বেরিয়ে না যান!

আলপনায় শুধু দেবীর পা নয়, জায়গা পায় কলমিলতা, ধানের শিষ, পদ্মপাতা, শঙ্খলতা, সূর্য, লাঙল, মই, পানপাতা, সিঁদুরকৌটো আর অবশ্যই প্যাঁচা। এই প্রতীকগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, লক্ষ্মীপূজার সঙ্গে বাংলার কৃষিজীবন ও গৃহস্থালির সম্পর্ক কত গভীর। ধানের শিষ ভালো ফসলের প্রত্যাশা বহন করে, লাঙল কৃষিকাজের প্রতীক, পদ্ম শুভ ও সৌন্দর্যের চিহ্ন। অর্থাৎ লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা কেবল সোনাদানা বা নগদ অর্থের জন্য নয়; মাঠে ফসল হোক, গোলায় ধান থাকুক, সংসারে খাবারের অভাব না হোক—সেই কামনাও পূজার প্রতিটি অনুষঙ্গে মিশে রয়েছে। একসময় বাংলার সমৃদ্ধির প্রধান মাপকাঠি ছিল জমি, ফসল ও গোলাভরা ধান। তাই লক্ষ্মীর আরাধনায় কৃষিজীবনের ছাপ পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক।

কোজাগরী পূর্ণিমার আসল নাটক শুরু হয় রাতের বেলায়। চারদিকে নিস্তব্ধতা, আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, উঠোনে আলপনা, ঘরে প্রদীপের আলো। এমন সময় দেবী নাকি বেরিয়ে পড়েন তাঁর রাত্রিকালীন পরিদর্শনে। প্রশ্ন একটাই—কে জেগে আছে? ভাবুন তো, দেবী যদি সত্যিই এক রাতের জন্য পৃথিবীর সমস্ত গৃহস্থের খোঁজ নিতে বেরোন, তাহলে তাঁর কতটা পরিশ্রম! এত বাড়ি, এত উঠোন, এত দরজা—সব জায়গায় পৌঁছনো কি আর সহজ কথা? ভাগ্যিস তাঁর সঙ্গে রয়েছে এক বিশেষ সহকারী, লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচা।

প্যাঁচাকে ভাবা যেতে পারে দেবীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী, নাইট ওয়াচম্যান, এমনকি একাধারে এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট ও ড্রাইভারও! দিনের বেলায় তার চোখে যেন ঘুমের পর্দা, কিন্তু রাত নামলেই সে সজাগ। গোল গোল চোখ মেলে অন্ধকারের মধ্যে তার নজরদারি চলে। কোন বাড়ির উঠোনে ধানের শিষ, কোথায় গোলাভরা শস্য, কোন সংসারে সমৃদ্ধির আয়োজন—সব খবরই যেন তার নখদর্পণে। দেবী লক্ষ্মী যদি হন সম্পদের প্রধান নির্বাহী, তাহলে প্যাঁচাই তাঁর রাতের শিফটের বিশ্বস্ত কর্মী। পূর্ণিমার আলোয় তার ধবধবে পাখা মেলে উড়ে চলার দৃশ্য কল্পনা করলেই লোককথার জগৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে। অবশ্য আধুনিক করপোরেট দুনিয়ায় এমন কর্মীর জন্য ওভারটাইম, যাতায়াত ভাতা কিংবা রাতের খাবারের ব্যবস্থা আছে কি না, তা জানা যায় না!

কিন্তু লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে প্যাঁচাকেই কেন বেছে নেওয়া হলো? এর উত্তর খুঁজতে গেলে ধর্মীয় প্রতীক ও লোকবিশ্বাসের জগতে প্রবেশ করতে হয়। প্যাঁচা নিশাচর প্রাণী। দিনের আলোয় আড়ালে থাকলেও রাতের অন্ধকারে সে সক্রিয়। এক ব্যাখ্যায়, তার এই স্বভাব নির্জনতা, সংযম ও সাধনার প্রতীক। যে মানুষ জাগতিক মোহ-মায়ার বাইরে গিয়ে আত্মনিয়োগ করতে পারে, তার মধ্যেই আধ্যাত্মিক উপলব্ধির সম্ভাবনা থাকে। প্যাঁচার গোপনচারী স্বভাবও সেই নির্জন সাধনার সঙ্গে তুলনীয়। এই ব্যাখ্যা ধর্মীয় ও প্রতীকী; এর অর্থ এই নয় যে প্যাঁচার প্রতিটি আচরণের পেছনে কোনো একটিমাত্র শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা রয়েছে। বরং লোকবিশ্বাসে প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যকে মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

প্যাঁচার সঙ্গে লক্ষ্মীর সম্পর্কের আরেকটি ব্যাখ্যা আরও বাস্তবধর্মী। প্যাঁচা ইঁদুর খায়, আর ইঁদুর শস্যের বড় শত্রু। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর সমাজে গোলার ধান রক্ষা করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় প্যাঁচা কৃষকের উপকারী প্রাণী—শস্যের ক্ষতি কমাতে তার ভূমিকা রয়েছে। যে প্রাণী ধান রক্ষায় সহায়তা করে, তাকে শস্য ও সমৃদ্ধির দেবীর বাহন হিসেবে কল্পনা করা অস্বাভাবিক নয়। এখানে পুরাণের প্রতীকী জগতের সঙ্গে কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলে যায়। লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচা তাই কেবল একটি পৌরাণিক অনুষঙ্গ নয়; বাংলার কৃষিজীবন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কেরও স্মারক।

কিন্তু সেই প্যাঁচা আজ কোথায়? প্রশ্নটি কেবল একটি পাখিকে খুঁজে না পাওয়ার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের বদলে যাওয়া পরিবেশের গল্প। শহরের আকাশে বহুতল ভবন, কংক্রিটের দেয়াল আর কৃত্রিম আলোর আধিপত্য। পুরোনো গাছ কমছে, গাছের কোটর হারিয়ে যাচ্ছে, খোলা জমি ও ঝোপঝাড় সংকুচিত হচ্ছে। গ্রামেও কৃষির ধরন বদলাচ্ছে, রাসায়নিকের ব্যবহার ও আবাসস্থলের পরিবর্তন বহু বন্যপ্রাণীর জীবনকে কঠিন করে তুলছে। প্যাঁচার সব প্রজাতির অবস্থা এক নয়, আর সব এলাকায় তাদের সংখ্যা একইভাবে কমেছে—এমন সিদ্ধান্তও প্রমাণ ছাড়া দেওয়া যায় না। তবু আবাসস্থল নষ্ট হওয়া, খাদ্যের সংকট ও মানুষের নির্বিচার হস্তক্ষেপ নিশাচর পাখিদের জন্য যে বড় চ্যালেঞ্জ, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

একসময় লক্ষ্মীপূজার আলপনায় প্যাঁচা আঁকা হতো, কারণ বাস্তবের প্রকৃতিতেও তার উপস্থিতি ছিল পরিচিত। আজ অনেক বাড়িতে প্যাঁচার ছবি আছে, কিন্তু আশপাশের গাছে সত্যিকারের প্যাঁচা দেখা যায় কি? দেবীর বাহনকে আমরা পূজার প্রতীকে ধরে রেখেছি, অথচ তার বেঁচে থাকার পরিবেশটুকু রক্ষা করতে কতটা উদ্যোগী হয়েছি? পূজার রাতে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকার সময় আমরা ঘরে সমৃদ্ধির প্রবেশ কামনা করি, কিন্তু সেই সমৃদ্ধির সঙ্গে প্রকৃতির যে গভীর সম্পর্ক, তা কি মনে রাখি?

কোজাগরী পূর্ণিমায় আমরা রাত জেগে দেবীর অপেক্ষা করি—কে জেগে আছে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। কিন্তু আজ প্রশ্নটি যেন উল্টে আমাদের দিকেই ফিরে আসে; প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য কে জেগে আছে? লক্ষ্মীর আগমনের প্রত্যাশায় আমরা ঘরের দরজা খুলে রাখি, অথচ প্যাঁচার বেঁচে থাকার দরজা কি ক্রমেই বন্ধ করে দিচ্ছি না?

দেবী লক্ষ্মী আসবেন কি না, তা বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু প্রকৃতির সম্পদ রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব। প্যাঁচা হারিয়ে গেলে দেবীর পৌরাণিক বাহনের একটি ছবি হয়তো আলপনায় থেকে যাবে, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের বাস্তব সম্পর্কটি ক্রমে মুছে যাবে। তখন ধনসম্পদের দেবীর পূজা জাঁকজমক করে করেও আমরা হয়তো প্রকৃত সমৃদ্ধির অর্থ ভুলে বসবো।

লক্ষ্মীকে ঘরে আনতে চাইলে শুধু প্রদীপ জ্বালালেই হবে না, প্রকৃতিকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নইলে একদিন দেবীর ছবি থাকবে, পূজার আয়োজনও থাকবে—শুধু লক্ষ্মীর বাহনটিই থাকবে না। আর প্যাঁচা হারিয়ে গেলে, সত্যিকারের অর্থে লক্ষ্মীছাড়া হয়ে পড়বো না তো আমরাই?

/ইউএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ভাড়া বাসা থেকে কুবি শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার, পরিবারের দাবি হত্যা
ভাড়া বাসা থেকে কুবি শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার, পরিবারের দাবি হত্যা
তিন দিন পর সচল বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট
তিন দিন পর সচল বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট
মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের নিশানা করতে প্রস্তুত ইরান: নিউইয়র্ক টাইমস
মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের নিশানা করতে প্রস্তুত ইরান: নিউইয়র্ক টাইমস
‘তুচ্ছ কারণে’ লাল কার্ড দেখলেন নেইমার, সমালোচনার ঝড়
‘তুচ্ছ কারণে’ লাল কার্ড দেখলেন নেইমার, সমালোচনার ঝড়
সর্বশেষ সর্বাধিক