নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এবং তার ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায় কেন্দ্রীয় বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নাটোর জেলা বিএনপি। তবে বিশেষ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাঁচ দিন পরও কেন্দ্রকে কোনও প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি। এ নিয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ। তার অভিযোগ, এমপি আব্দুল আজিজের ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কেন্দ্রীয় বিএনপিকে লিখিতভাবে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু জেলা কমিটির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজসহ কয়েকজন সদস্য এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কিছু জানাতে চাইছেন না। এতে কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
জেলা বিএনপির একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি এমপি আব্দুল আজিজের একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে তার ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় গ্রেফতার হন। এ ছাড়া ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো ঘটনাও আলোচনায় আসে। এসব ঘটনায় পিতা-পুত্রকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
সূত্রটির দাবি, ভিডিওটি নিয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে বিশেষ সভায় বসে নাটোর জেলা বিএনপি। প্রায় আট ঘণ্টার ওই সভায় জেলা কমিটির অন্তত ১৮ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
সভায় শাকিল হত্যা মামলায় দুই দফায় রিমান্ডে থাকা এমপিপুত্র মিন্টুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং আব্দুল আজিজের ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পরে দলের গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে এসব বিষয়ে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে কেন্দ্রীয় বিএনপিকে লিখিতভাবে জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, আমরা সবগুলো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছি। শাকিল হত্যায় কে কার সন্তান, তা না দেখে অপরাধীদের অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে বিচার করতে হবে। তাছাড়া এমপি আজিজের ভাইরাল ভিডিওর বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আমরা সর্বসম্মতিক্রমে দলের উচ্চপর্যায়ে লিখিতভাবে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু অদৃশ্য কোনও কারণে জেলা কমিটির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজ কেন্দ্রীয় বিএনপিকে কিছুই জানাতে চাচ্ছেন না।
সিদ্ধান্তের পাঁচ দিন পর মঙ্গলবার বিকাল ৫টায় নাটোর শহরের হরিশপুরে নিজ কার্যালয়ে আবারও সংবাদ সম্মেলন করেন আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, বিশেষ সভায় সিদ্ধান্ত হলেও ১ নভেম্বর কমিটির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কোনও প্রতিবেদন পাঠাতে চাননি। তার আপত্তির কারণে শাকিল হত্যা ও এমপি আজিজের ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে সাংগঠনিক প্রতিবেদন পাঠানো সম্ভব হয়নি। তবে এখন তিনি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবেদনটি দলের উচ্চপর্যায়ে পাঠাবেন।
আসাদুজ্জামান আরও বলেন, জেলা বিএনপির মধ্যে বিভক্তি তৈরি হওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন তিনি। তার দাবি, কেন্দ্রীয় নেতারা ইতিমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে এমপি আব্দুল আজিজের ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সত্যতা যাচাই করছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান, সদস্য আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আবদুল কাদের মিয়াসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজ সদস্যসচিবের অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, কমিটির মাত্র ছয়জনকে নিয়ে সদস্যসচিব সংবাদ সম্মেলন করেছেন। অথচ কমিটিতে ৩৪ জন সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত আমি আমার কমিটির একজন যুগ্ম আহ্বায়কের বিষয়ে তদন্ত বা সাংগঠনিক প্রতিবেদন দিতে পারি না। তাই আমি সদস্যসচিবের ঘোষিত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২)। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর থানায় মামলা করেন তার বাবা রবিউল ইসলাম।
হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে শাকিল মারা যান। পরদিন মঙ্গলবার তার জানাজা শেষে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আমেরিকাপ্রবাসী রাসেলের একটি শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনার পর এমপি আব্দুল আজিজকে ঘিরে সমালোচনা আরও বাড়ে। বুধবার সকাল থেকে তার একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপে পড়েছেন এমপি আব্দুল আজিজ।