জঙ্গি উজ্জ্বলের চাকরিদাতা মিলন সম্পর্কে স্বজনরা যা বললেন

মোয়াজ্জেম হোসেন, হাতীবান্ধার কেতকিবাড়ি থেকে ফিরে
১৮ জুলাই ২০১৬, ২৩:৪০আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৬, ০১:০৬

জঙ্গি উজ্জ্বলের চাকরিদাতা মিলনের স্বজন গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় নিহত জঙ্গি শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বলের চাকুরিদাতা লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার কেতকিবাড়ির মিলন হোসাইনের পরিবারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিহত জঙ্গি শফিকুলের ঘনিষ্ট সহযোগী মিলন হোসাইন হাতীবান্ধার নওদাবাস ইউনিয়নের কেতকিবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৪ সালে এসএসসি পাস করার পর গ্রাম ছাড়েন। তিনি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে বড় বোনের বাড়িতে ও রাজধানী ঢাকায় বেড়ে ওঠেন। তার বন্ধু-বান্ধবও এই দুই জায়গায় রয়েছে। বিয়েও করেছেন ঢাকার পবনারটেক ভাদাইল এলাকায়। সেখানেই প্রথমে মাদবর মেমোরিয়াল একাডেমিতে পরে পিয়ার আলী স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষকতা শুরু করেন।
হাতীবান্ধা উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে নওদাবাস ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের কেতকিবাড়ি গ্রামে আব্দুল জলিলের বাড়ি। সোমবার দুপুর ১২টায় সরজমিনে আব্দুল জলিলের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, জলিল-মনোয়ারা দম্পতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। এ বাড়িতেই স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও তাদের ছোট ছেলে সাইফুল ইসলাম সুমন ও ছোট ছেলের স্ত্রী রেহেনা পারভীন লিপি থাকেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় মেয়ে রেহেনা বেগমের সঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ২নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার রিয়াজুল ইসলামের এবং ছোট মেয়ে রিজিয়া সুলতানার সঙ্গে একই উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের বিলুপ্ত গোতামারী ছিটমহলের বাসিন্দা কৃষক জিয়ারুল ইসলামের বিয়ে হয়।

পরিবারের বড় ছেলে মিলনকে মাসে ৩ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পাঠাতেন বলে নিশ্চিত করেছেন আব্দুল জলিল। টাকার পাঠানোর ব্যাখ্যা হিসেবে বলেন, ‘ঢাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতে অনেক টাকা প্রয়োজন। এজন্যই টাকা পাঠাতাম।’ জানান, মিলনের শ্বশুর অসুস্থ হওয়ায় শ্বাশুড়ি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। মিলনের স্ত্রী পরিবারে বড়। তারা তিন বোন। পিয়ার আলী স্কুলে মেজো বোন ৫ম শ্রেণিতে ও ছোট বোনটি নার্সারীতে পড়ে বলে জানান আব্দুল জলিলের পুত্রবধূ রেহেনা পারভীন লিপি। 

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মিলন ২০০৪ সালে হাতীবান্ধার কেতকিবাড়ি বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করার পর নাগেশ্বরী ডিগ্রি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করে রাজধানী ঢাকায় চলে যান। ঢাকার উত্তরা টাউন ডিগ্রি কলেজ থেকে মার্কেটিং বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স পাস করেন। ঢাকায় পড়ালেখার সুযোগে আশুলিয়ার পবনারটেক এলাকার নুর ইসলামের বড় মেয়ে জহুরা বেগমের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে পারিবারিকভাবে ২০১৪ সালের ১৭ মার্চ তাদের বিয়ে হয়। ১ বছর ৪ মাস বয়সী মিথিলা নামে সংসারে একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। জলিলের ছোট ছেলে সুমনের স্ত্রী রংপুর সরকারি কলেজের বোটানি বিষয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।

মা মনোয়ারা বেগম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ছোট বেলা থেকে খুবই শান্ত ছিল মিলন। আত্মীয়-স্বজন ছাড়া তেমন কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই তার। এসএসসি পাস করার পর বড় মেয়ের বাড়িতে ছিল। সেখান থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকার উত্তরা টাউন ডিগ্রি কলেজে মার্কেটিং বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স পড়াশোনা শেষ করে। পারিবারিকভাবে ঢাকার আশুলিয়ার পবনারটেক ভাদাইলের নুর ইসলামের বড় মেয়ে জহুরা বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে সেখানেই বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত। ভাদাইলে পিয়ার আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করতেন। কিন্তু মিলন সেখানে কার সঙ্গে মিশতেন, চলাফেরা করত তা সঠিক জানা নেই।’

এক প্রশ্নের উত্তরে আব্দুল জলিল বলেন, ‘গত জুন মাসের ২৩ তারিখ নাতনি মিথিলা, বউ জহুরা ও মিলন বাড়িতে আসে। গত ১২ জুলাই মিলন একাই ঢাকায় ফেরত যায়। কোরবানি ঈদের পর নাতনি ও বউ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত ১৩ জুলাই বেয়াইন রোখছানার মাধ্যমে মোবাইলে জানতে পারি, মিলনকে স্কুল থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। ১৪ জুলাই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে পরদিন ১৫ জুলাই ঢাকায় পৌঁছে নিখোঁজ মিলনের সন্ধানে আমি, বেয়াইন ও বৌমাসহ আশুলিয়া থানায় বিকেল ৫টায় উপস্থিত হয়ে জিডি করার জন্য পুলিশের সহায়তা চাই। সেখানে পুলিশ জানায় মিলনকে তারা আটক করেছে।’

মিলন আটকের কারণ জানতে চাইলে জলিল বলেন, ‘গুলশানের রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার ঘটনায় নিহত উজ্জ্বলের সহযোগী হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ মারফত জানতে পেরেছি। বিশ্বাসই হয় না আমার ছেলে মিলন  জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। সত্যিই যদি মিলন দোষী হয়ে থাকে তাহলে কঠিন বিচার চাই। আর যদি নির্দোষ হয় তাহলে তার মুক্তি চাই।’

এদিকে, হাতীবান্ধা উপজেলার নওদাবাস ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা নূরনবী হোসেন বলেন, মিলন হোসাইনের বাবা আব্দুল জলিলদের পরিবার কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন, যতদুর জানি, মিলন হোসাইন কেতকিবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে আপন দুলাভাইয়ের(ভগ্নিপতি) বাড়ি থেকে পড়াশুনা করে। পরে সেখান থেকে ঢাকায় থাকতো। সেখানে বিয়েও হয়েছে। মাঝে মধ্যে বাড়ি আসত। নামাজও পড়তো। একই কথা বলেন প্রতিবেশি আফজাল হোসেন, মনির হোসেন, রুহুল আমীন ও মিলনের মামাতো ভাই আজিজার রহমান।

মিলনের দুলাভাই রিয়াজুল ইসলাম মোবাইল ফোনে জানান, তিনি নাগেশ্বরী পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ২নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। এছাড়াও তিনি সমাজ কল্যাণ বালিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

মিলন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিলন খুবই ভালো ছেলে। আর কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ওর সম্পৃক্ততা নেই।

হাতীবান্ধা থানার ওসি রেজাউল করিম বলেন, ‘আশুলিয়া থানার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরে মিলন হোসাইনের পরিবারের ব্যাপারে তথ্যানুসন্ধান করছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের নজরদারীর মধ্যে রয়েছে পরিবারটি।’  

/এইচকে/আপ: এনএস/

আরওপড়ুন: নারায়ণগঞ্জে আসামিকে ছিনিয়ে নিতে ছাত্রলীগ-পুলিশ সংঘর্ষ, আটক

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম