গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার বন্যা কবলিত সাঘাটা, ফুলছড়ি, সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, পশু খাদ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের চরম সংকট। বন্ধ রয়েছে ৮৩টি স্কুল।
মঙ্গলবার ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৫৬ সে. মি. এবং ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি ৫৭ সে. মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি ২১ সে.মি. ও করতোয়ার পানি তিন সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়।
একই দিন বন্যার পানিতে ডুবে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চরিতাবাড়ি চরের দোলন মিয়া (২) নামে এক শিশু মারা গেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, চারটি উপজেলার কয়েক হাজার পানিবন্দি মানুষ বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র ও বিভিন্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ আবার নিজ বাড়ির পাশে নৌকায় সংসার পেতেছে।
কিন্তু বন্যা কবলিত এলাকার নলকূপগুলো ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। এদিকে চুরি ও ডাকাতের ভয়ে পালা করে বানভাসী মানুষ রাতজেগে পাহারা দিচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারণে বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে নদী ভাঙনের তীব্রতাও বেড়েছে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম, সাঘাটার ঘুড়িদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান সরকার ও ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য খলিল হোসেন জানান, ত্রাণের জন্য বানভাসী মানুষজন তাদের কাছে আসছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ না থাকায় কিছুই করতে পারছেন না। অন্যান্য বছরে এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ত্রাণ সহায়তা করলেও এবছর এখন পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি।
ফজলুপুর ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জালাল জানান, নদী ভাঙনে উত্তর খাটিয়ামারী জামে মসজিদ, চন্দনস্বর জামে মসজিদ, উত্তর খাটিয়ামারী নুরানি মাদ্রাসাসহ ফজলুপুর ইউনিয়নের ৪ শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে।
এদিকে ফুলছড়ির কাতলামারি ও সদরের কামারজানি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ফাটল ধরায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলে রক্ষার চেষ্টা করছে। গাইবান্ধার ঘাঘট নদীর শহর রক্ষা বাঁধও এখন হুমকির মুখে। মানুষ রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিচ্ছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কৃষ্ণ সরকার জানান, শহর রক্ষা বাঁধের গোদারহাট, দশানি, কোমরনই, বাগুরিয়া ও কুঠিপাড়া পয়েন্টে মেরামত কাজ অব্যাহত রয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, পানি অব্যাহত থাকায় এ পর্যন্ত জেলার বন্যা কবলিত সাঘাটা, ফুলছড়ি, সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৩২টি ইউনিয়নের ২১৭টি গ্রামের ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭৩ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সরকারিভাবে জেলার পানিবন্দি মানুষদের জন্য ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও সদর উপজেলায় ৩৭টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ভাঙনের ফলে ৩ হাজার ৪২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ ও ১ হাজার ৬৫৮টি বাড়ি ভেঙে গেছে। ১৫৪ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক বিধ্বস্ত ও ৬০৩টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম জানান, বন্যা কবলিত এলাকায় বিদ্যালয়ে পানি ওঠায় জেলার ৮২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন আকতার জানান, এখন শুধু মাত্র একটি মাধ্যমিক স্কুলের পাঠদান বন্ধ আছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ আ কা ম রুহুল আমিন জানান, বন্যায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির আউস, রোপা আমন, আমন বীজতলা ও শাকসবজি নিমজ্জিত হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন দফতর জানান, এপর্যন্ত তিন শ’ মেট্রিক টন চাল, ৫ লাখ টাকার শুকনা খাবার ও ২ লাখ নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে ত্রাণ মন্ত্রনালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে।
/এনএস/এমএনএইচ/








