সরকারি ত্রাণ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে রংপুর চিনিকলের জমি উদ্ধারে বসতি উচ্ছেদের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল পরিবারগুলো। সোমবার সকালে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মাদারপুরে ত্রাণ বিতরণের জন্য গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে বিফল হয়ে ফিরে এসেছেন।
বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৮টায় ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের ত্রাণ দিতে মাদারপুর গ্রামে যাই। তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে ত্রাণ নিতে বলেছি। কিন্তু তারা ত্রাণ নিতে রাজি নন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সকাল থেকে মাদারপুর গির্জার সামনে ত্রাণ নিয়ে অপেক্ষা করে বিকাল ৫টা দিকে উপজেলা পরিষদে ফিরে এসেছি।’
এদিকে, আজ সকালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া তার সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে রিলিফের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো রিলিফ নিতে চাইলেও স্বার্থান্বেষী ওই মহলটি তাদের রিলিফ গ্রহণে বাধা দিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো স্বার্থান্বেষী মহলের ভয়ে রিলিফ নিচ্ছে না।’
সোমবার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারে উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত মাদারপুর ও জয়পুর পল্লীর সাঁওতালদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতে ওই এলাকায় যান গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল হান্নান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম ও ওই ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুর রউফ। কিন্তু তারা ঘন্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও কোনও সাঁওতাল পরিবার ত্রাণ নিতে আসেননি।
সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের ৬নং ওয়ার্ডের এই ইউপি মেম্বার জানান, তারা সকাল ৮টার দিকে গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর গ্রামে গিয়ে ওই গ্রামের সাঁওতালদের মণ্ডল (মাতব্বর) বারনাবাস টুডুকে ডেকে নিয়ে আসেন। এ সময় ত্রাণের কথা জানানো হলে বারনাবাস টুডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলেন, ‘ধর্মীয় নেতাসহ অন্যান্য নেতা এবং সাঁওতাল পরিবারগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে বিষয়টি জানাচ্ছি।’ এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। তাকে কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ওই এলাকার মেম্বার সব সাঁওতাল পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কেউ ত্রাণ নিতে আসেননি।
তিনি আরও জানান, সাঁওতালদের দাবি হচ্ছে উচ্ছেদকৃত জমিতেই তাদের পুনর্বাসিত করতে হবে। ওই জমির চারপাশ থেকে অবিলম্বে চিনিকল কর্তৃপক্ষের কাঁটাতারের বেড়া অপসারণ ও আখ চাষ বন্ধ করতে হবে। সাঁওতালদের বিরুদ্ধে দায়ের মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। এছাড়া গোবিন্দগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ ও সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদ বুলবুলসহ তাদের উচ্ছেদ, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটে সহযোগিতাকারী এবং তাদের জমি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনার বিচার ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
ওই সাঁওতাল পল্লীর বাসিন্দা পাওলুস মাস্টার বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যে ত্রাণ আনা হয়েছে- এর পেছনে আবার না কোন ষড়যন্ত্র আছে?’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি এই প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়েছে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি ত্রাণ গ্রহণ করা হবে না।’
তিনি বলেন, ‘দেখে যান আমাদের গ্রাম ঘেষে মিল কর্তৃপক্ষ কীভাবে কাটা তারের বেড়া তৈরি করেছে। আমরা এখন অবরুদ্ধ।’
ওই গ্রামের সুভাষ হেমভ্রম জানান, স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘকালের সহাবস্থান ও আন্তরিক সম্পর্ক। কিন্তু কিছু সংখ্যক প্রতারকের কারণে তারা যেমন সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারে বসতি গড়ে ছিলেন। তেমনি ওই প্রতারকরাই আবার সেই বসতি থেকে আজ তাদের উচ্ছেদ করলো।
তিনি বলেন, অনেকে পুলিশের ভয়ে অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। দিনে এলাকায় থাকলেও রাতে আবার অন্য জায়গায় গিয়ে ঘুমান। ঘটনার দিন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিরপেক্ষ ভূমিকা না রাখায় তাদের ওপরও আস্তা রাখতে ভয় পাচ্ছেন।
মেরিং টুডু, মামনি বাস্কে বলেন, না খেয়ে মরে যাবেন কিন্তু এসব ঘটনার বিচার না করা পর্যন্ত তারা সরকারের কোনও সাহায্য গ্রহণ করবেন না।
তারা আরও জানান, এখনও মাদারপুর চার্চের সামনে খোলা আকাশের নিচে ও চার্চের পরিত্যক্ত স্কুল ঘরে দেড়শ সাঁওতাল পরিবার শীতের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এছাড়া বাইর থেকে হামলার আশঙ্কায় গ্রাম দুটিতে পালা করে রাত জেগে পাহারা দেওয়া হচ্ছে।
ত্রাণ নিচ্ছেন না কেন জানতে চাইলে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহ সভাপতি ফিলিমিন বাস্কে মুঠোফোনে বলেন, প্রশাসন একমুখে দুই কথা বলছে। তারা একদিকে ত্রাণ দিতে চাইছে, অন্যদিকে তারকাটার বেড়া দিয়ে আমাদের জমি নষ্ট করছে। তাই আমরা প্রশাসনের কোনও ত্রাণ নেইনি।
তিনি সাঁওতালদের নামে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, প্রশাসন নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কোনও কাজ হচ্ছে না। এছাড়া ঘটনার ৯দিনেও সাঁওতালদের ঘরে আগুন, আমাদের পুরোনো বসতবাড়িতে লুটপাট ও সাঁওতাল হত্যার ঘটনায় মামলা ও তদন্ত কমিটি হয়নি। আমরা এসব ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্ত চাই।
উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সামাদ সাঁওতালদের জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা হিসেবে ছয় মেট্রিক টন চাল এবং ৫০ হাজার টাকা, তিনশ কম্বল বরাদ্দ করেন। ওই দুটি গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত দেড়শ পরিবারের জন্য ২০ কেজি করে চাল, এক কেজি ডাল, এক লিটার সয়াবিন তেল, এক কেজি লবন, এক কেজি আলু ও দুটি করে কম্বল বিতরণের কথা ছিল। এছাড়াও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়, গৃহহীন ছিন্নমূল সাঁওতাল পরিবারগুলো পুর্নবাসনের জন্য গোবিন্দগঞ্জের কাটাবাড়ি এলাকায় ১০ একর খাস জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেখানে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রংপুর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে তীরবিদ্ধ হন ৯ পুলিশ সদস্য এবং গুলিবিদ্ধ হন চার জন সাঁওতাল। এদের মধ্যে তিন সাঁওতাল নিহত হন। পরবর্তীতে পুলিশ-র্যাব ওই দিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এক অভিযান চালিয়ে মিলের জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে। এ সময় তাদের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে লুটপাট চালায় স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে ৬ নভেম্বর রাতে ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে সাড়ে ৩শ’ জনকে আসামি দেখিয়ে মামলা দায়ের করেন। এ পর্যন্ত পুলিশ চার জনকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু হত্যার ঘটনায় এখনও কোনও মামলা হয়নি। এমনকি ওই ঘটনায় কোনও তদন্ত কমিটি গঠন হয়নি। চলতি বছরের এক জুলাই থেকে সাঁওতালরা মিলের ওই জমিতে ঘর তুলে বসবাস করা শুরু করেন।
আরও পড়ুন:
তিন আদিবাসীর হাতকড়া খুলে দেওয়া হলো
/বিটি/এইচকে/








