দোষীদের বাঁচাতে সাঁওতালদের নাম করে কেউ মামলা করেছে বলে দাবি করেছেন সাঁওতাল পল্লির উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাঁওতালদের দাবি,চিহ্নিত দোষীদের বাঁচাতে এ মামলা করা হয়েছে। মামলাটি ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে করা হয়নি। যারা উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত,এটা তাদেরই নতুন কোনও ফন্দি হতে পারে।
মামলা প্রসঙ্গে মাদারপুর গ্রামের ভুবেন মার্ডি বলেন,‘আমরা কেউই জানি না, কিভাবে এ মামলা হয়েছে। আমাদের ওপর হামলার ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটেছে। তাহলে এ মামলায় কেন অজ্ঞতনামা আসামি হবে?’
বুধবার (১৬ নভেম্বর) গভীর রাতে সাঁওতালদের পক্ষ থেকে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মুয়ালীপাড়া গ্রামের স্বপন মরমু বাদী হয়ে ৫/৬শ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় কোনও এজাহার নামীয় আসামি করা হয়নি।
সরেজমিনে গিয়ে সাঁওতাল পল্লির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই মামলা নিয়ে তারা বিস্মিত। সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার এলাকায় সাঁওতালদের ওপর হামলার সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত এবং ইন্ধনদাতা সেসব প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম মামলায় নেই।
সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রাফায়েল হাসদার বলেন, ‘এই মামলা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। কী উদ্দেশ্যে এবং কার স্বার্থে মামলা করেছেন, সেটা স্বপনই ভালো বলতে পারবেন। তার বাড়ি কোথায় সেটাও আমাদের জানা নেই।’
সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কের দাবি,‘অতি উৎসাহী হয়ে মূল ঘটনা আড়াল করতে কথিত স্বপন মরমুর নামে এ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। স্বপন মরমু ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ নন। তাকে আমরা চিনি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিরীহ কেউ পুলিশি হয়রানির শিকার হোক সেটা আমরা চাই না। কারণ, সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার কমিটি বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লাকজন মিলেমিশে করা হয়েছে। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানরাও আমাদের সঙ্গে তাদের বাপ-দাদার ভূমি উদ্ধারের জন্য আন্দোলন করেছে।’
মামলা দায়েরের পর বাঙালি পুরুষরা গ্রেফতার আতঙ্কে রাতে বাড়িতে থাকছেন না। মামলার পরপরই বুধবার রাত থেকেই পুলিশ অভিযানে নেমেছে।
চক রহিমপুর গ্রামের মনির উদ্দিন জানান, ‘এ ঘটনার সঙ্গে তার ছেলে মানিক জড়িত নয়। তারপরও পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে।’
আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, ‘প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার জন্য সাঁওতালদের নাম ভাঙিয়ে অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। কারা এ কাজ করলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ’
তিনি বলেন, ‘সাঁওতালদের ভূমি উদ্ধার কমিটির পক্ষ থেকে এরইমধ্যে আইনি প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী রবিবার অথবা সোমবার বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হবে। স্বপন মরমুর এই মামলার সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালের কোনও যোগসূত্র নেই। এটি কোনও ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।’
নিরীহ লোকদের গ্রেফতারের অভিযোগ অস্বীকার করে গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত কুমার সরকার বলেন, ‘আধিবাসীদের একজন তো এই মামলাটি করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কিনা সেটা আমার জানা নাই।’
গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘স্বপন মরমুর বাড়ি বাগদা ফার্মের কাছেই। তাকে সাঁওতালরা চেনে কিনা, তা আমাদের জানার কথা নয়। তবে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, ৬ নভেম্বর রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। পুলিশের গুলিতে তিন জন সাঁওতাল পুরুষ নিহত হন। পরবর্তীতে পুলিশ-র্যাব ওই দিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এক অভিযান চালিয়ে মিলের ওই জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে। এসময় তাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ও লুটপাট চালায় স্থানীয় দুর্বৃত্তরা।
এসটি/ এপিএইচ/








