নীলফামারীতে বোরো ধান ক্ষেতে ব্যাপক হারে নেক ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। এতে করে গাছের গোড়ায় পচন ধরে শীষ শুকিয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিভাগের নানা পরামর্শ ও কীটনাশক দিয়ে কোনওভাবেই এ রোগ দমন করা যাচ্ছে না। নেক ব্লাস্টের কারণে শতকরা ৫০ ভাগ ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
সূত্র মতে, এবার জেলায় ৮২ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে বোরা ধান চাষ করা হয়েছে। গত ২০ দিন ধরে আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে নানা রোগ বালাই দেখা দিয়েছে। নেক ব্লাস্ট রোগে কুশি অবস্থায় পাতায় প্রথমে ডিমের মতো ছোট ছোট দাগ হয়। দাগের মাঝখানে ধুসর (ছাই) এবং চর্তুদিকে গাঢ় বাদামি রং ধারণ করে। আক্রমণ মারাত্বক হলে সম্পূর্ণ পাতা এমনকি পুরো গোছা ঝলসে যেতে পারে। একে পাতা ব্লাস্ট বলে। আক্রান্ত গোছার শেকড় কালচে রং হয়ে পচে যায়। ধান গাছের গিট আক্রান্ত হলে আক্রান্ত স্থান কালচে রং হয় ও গাছ ভেঙে পড়ে। একে নেক ব্লাস্ট বলে।
সদরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ারুল হক বলেন, ‘এবারে কারেন্ট পোকা, ন্যাদা পোকা, পাতা মোড়ানো ও গোড়া পচা রোগের কারণে ধানের শীষ শুকিয়ে পাতান (চালনেই) দেখা দিয়েছে। এতে কৃষকরা বিপাকে পড়েছে। নীলফামারী সদর উপজেলাসহ ডোমার, ডিমলা, জরঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর উপজেলায় শতকরা ৫০ ভাগ ধানক্ষেত পুড়ে গেছে।’
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেক ব্লাস্ট রোগ রাতারাতি এক জমি থেকে অন্য জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি একটি ছত্রাকনাশক রোগ।
সদরের রামনগর, কচুকাটা, টুপামারী, পঞ্চপুকুর, কুখাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে কৃষকরা আতঙ্ক হয়ে কাচা ও আধাপাকা ধান কেটে ফেলছে।
নীলফামারী সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমি চার বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। প্রয়োজনীয় সার, কীটনাশক দিয়েছি জমিতে। কিন্ত গত ১৫ দিন ধরে হঠাৎ ধান গাছের পাতা পুড়ে যাচ্ছে। এছাড়া বেশিরভাগ শীষে ধান (পাতান) নেই। ফলে কৃষকরা উপায় না পেয়ে কাচা ধান কেটে ফেলছে।’
একই এলাকার কৃষক জবেত আলী বলেন, ‘যেখানে এক বিঘা জমিতে ৩৫ থেকে ৪০ মন ধান পাওয়ার কথা সেখানে ৮/১০ মন ধান হতে পারে।’
নীলফামারী পৌরসভার কুখাপাড়া মহল্লার খয়রাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার দুই বিঘা জমির ধান একবারে পাতান হয়েছে। সার,বীজ, কীটনাশক, চাষের উপকরনসহ অন্যান্য জিনিশপত্র বাকিতে নিয়ে ধান চাষ করেছি। এখন এই টাকা কীভাবে পরিশোধ করবো, কীভাবে নিজেরা চলবো তা বুঝতে পারছি না।’
ওই এলাকার মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘এবার ধান বিক্রি করে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া, কাপড় চোপড় ও পরিবারের অন্যান্য খরচ কীভাবে জোগাড় করবো, মাথায় আসছে না।’
কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, কৃষি বিভাগের লোকজন সময় মতো তদারকিসহ ব্যবস্থাপত্র দিলে এমনটি হতো না।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক গোলাম মো. ইদ্রিস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়া কারণে ধান গাছের ব্যবহৃত কীটনাশক পানিতে মিশে অধিকাংশ ধানে নেক ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। এতে ধান গাছের পচন, পাতা মোড়ানো ও পোকার আক্রমণ দেখা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘দিনে গরম রাতে ঠান্ডা,ঘন কুয়াশা, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, ও ইউরিয়া সার বেশি ব্যবহারের কারণে এসব রোগ দেখা দিতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য মাঠ পর্যায়ে, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের মাঝে যথারীতি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তাদের ছুটি বাতিল করে কৃষকদের কাছে গিয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষনসহ বিভিন্ন পরামর্শের জন্য মাইকিং ও প্রচারপত্র বিলি করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত এ রোগ প্রতিরোধ করে মাঠ পর্যায়ে ভালো ফলাফল উঠে আসবে।’
/এআর/








