রংপুরে জেলা প্রশাসকের জাল সই ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে চারশ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান ঘটনার মূল নায়ক অফিস সহকারী শামসুল ইসলামকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি দুদক কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে, ঘটনা তদন্তের জন্য উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন রংপুরের জেলা প্রশাসক।
এ ঘটনায় রংপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাসের দায়ের করা মামলাটির তদন্ত ভার দুর্নীতি দমন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দুদক রংপুরের সহকারী পরিচালক জাকারিয়া হোসেনকে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দুদক রংপুরের উপপরিচালক মোজাহার আলী জানান, জিএম শাখা থেকে দেওয়া অস্ত্রের ভুয়া লাইসেন্স সংক্রান্ত সব ফাইল তলব করা হয়েছে। এ বিষয়ে বুধবার (৩১ মে) জেলা প্রশাসকের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার মূল নায়ক জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অফিস সহকারী শামসুল ইসলামকে গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ’
রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, এ সংক্রান্ত খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখার পর আমার অফিসে লাইসেন্স দেওয়া বিভিন্ন কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। গত দুবছরে তার দফতর থেকে মাত্র কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের কাছে একটি চিঠি দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে দেওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সগুলো বাতিল করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হলে পুলিশের পক্ষ থেকে সেসব লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এদিকে চারশ’র বেশি আগ্নেয়াস্ত্রের ভুয়া লাইসেন্স দেওয়া হলেও এর বিপরীতে ১৮৪টি আগ্নেয়াস্ত্র কেনা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে দুদক। এর মধ্যে দিনাজপুরের গনেশতলার মেসার্স মাহবুব আর্মস কোম্পানি থেকে ১১৭টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৫৮টি বিক্রি করা হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত ও বর্তমানে কর্মরত সেনা সদস্যদের নামে। কেনা হয়েছে শর্টগান, এক নলা বন্দুক ও পিস্তল। শুধু তাই নয় ভুয়া আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স যারা নিয়েছেন, তাদের বেশির ভাগ ব্যক্তির বাড়ি দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ ক্ষেত্রে লাইসেন্স নেওয়া ব্যক্তির ঠিকানা রংপুর উল্লেখ করা হলেও স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয়েছে অন্য জেলায়। যেমন আনিসুর রহমান নামে এক ব্যক্তি জাল লাইসেন্সের মাধ্যমে একনালা বন্দুক কিনেছেন। তার বাবার নাম আব্দুস সামাদ মণ্ডল উল্লেখ করা হলেও ঠিকানা দেখানো হয়েছে রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোড এলাকায়। আবার স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয়েছে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার দোলাপাড়া। একইভাবে আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি একটি একনলা বন্দুক কিনেছেন। তার বাবার নাম মৃত মুসলিম উদ্দিন বাসার ঠিকানা দেখানো হয়েছে দিনাজপুরের মধ্যবালু বাড়ি। এভাবে জাল আগ্নেয়াস্ত্রের বেশির ভাগ ব্যক্তির বাড়ি রংপুরের বাইরে। বাইরের জেলার ব্যক্তিকে কিভাবে লাইসেন্স দেওয়া হলো, তা নিয়েও হতবাক হয়েছেন জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা। কেনইবা সাবেক ও বর্তমান সেনা সদস্যরা ব্যাকডেটের আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স সংগ্রহ করলেন, তা নিয়েও তদন্ত করছেন সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।
তবে পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিভিন্ন কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে এসব আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয় প্রতি বছর এসব অস্ত্রের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। ফলে যারা লাইসেন্স নিয়েছেন তাদের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য সব পন্থাই অবলম্বন করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জেএম শাখার অফিস সহকারী শামসুল ইসলাম ছাড়াও আরও কয়েকজন জড়িত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অস্ত্রের লাইসেন্সের অনেকের ঠিকানা ভুয়া বলেও জানা গেছে। ফলে জাল লাইসেন্সের মাধ্যমে কেনা অস্ত্রগুলো এখন কোথায় তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রংপুরের জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুজ্জামান জানান, জেএম শাখার অস্ত্রের লাইসেন্সের সব কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখা হচ্ছে। অফিস সহকারী শামসুল ইসলামকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
দুদক রংপুরের উপ পরিচালক মোজাহার আলী জানান, জাল লাইসেন্স দিয়ে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে শামসুল। তার বাড়ি তল্লাশি করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তার বিলাসবহুল বাড়িসহ অনেক সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে।
মামলার তদন্তে অনেক অজানা তথ্য মিলছে বলেও জানান মোজাহার আলী।
/বিএল/ এপিএইচ/








