‘বান ডোবা (বন্যায় পানিবন্দি)। গরু দিয়া হাট ভরা, হাটত গরু মেলা (অনেক), সেইজন্যে দামও কম।’ কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি হাটে গরু নিয়ে আসা খালেক। নিজের পালন করা গরু প্রত্যাশিত দামে বিক্রি করতে না পারায় ফিরে যাওয়ার কারণ হিসেবে বাংলা ট্রিবিউনের এ প্রতিবেদককে তিনি এসব কথা বলেন।
একই হাটে গরু বিক্রি করতে আসা নূর আলম জানান, তার শাহিওয়াল জাতের বড় ষাড়টি বাড়িতেই মানুষ দাম বলেছিল ৮৫ হাজার টাকা। কিন্তু হাটে বেশি দামে বিক্রির আশায় নিয়ে আসলেও ক্রেতারা ৭৫ হাজার টাকার বেশি দাম বলছেন না।
উলিপুর হাটেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। হাটে গরু বিক্রি করতে আসা প্রায় সব বিক্রেতার মুখে নিরাশার ছায়া। বছরের এই একটি সময় গরুর মূল্য বেশি পাওয়ার আশায় অনেকে ছয় মাস-বছর ধরে গরু লালনপালন করলেও এবারের কোরবানির হাটে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না বলে জানান বেশ কয়েকজন বিক্রেতা।
সোমবার (২৮ আগস্ট) কুড়িগ্রামের উলিপুর ও সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি হাটে গিয়ে দেখা যায়, হাটে প্রচুর দেশি গরুর সমাগম ঘটেছে। ক্রেতাদেরও ভিড় ছিল উপচে পড়ার মতো। প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে যেমন বিক্রেতাদের মুখে হাসির অভাব, ক্রেতাদের বেলায় ঠিক এর উল্টো। গত বছরের তুলনায় এবার কম দামে গরু কিনতে পেরে ক্রেতারা অনেক খুশি। তারা মনে করছেন এবারে ঈদে কোরবানির গরুর দাম বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বেশ কম।
কাঁঠালবাড়ি হাটে গরু কিনতে আসা নেফারদরগা এলাকার আব্দুল মজিদ বলেন, ‘এই গরু ৫৫ হাজার টাকার নিচে কোনও ভাবেই পাওয়ার কথা না। এবার সেটা ৫১ হাজার টাকায় কিনতে পারছি। খুব ভালো লাগছে যে এবার গরুর দাম একটু কম।’
একই হাটে ৫০ হাজার টাকায় গরু কিনেছেন ত্রিমোহনী এলাকার আব্দুর রহমান। তিনিও মনে করছেন, গরুটি ৫/৬ হাজার টাকা কমে পেয়েছেন।
কুড়িগ্রামের বেশ কয়েকটি হাটে গরু বিক্রি করতে আসা খামারি ও ব্যাপারিদের সঙ্গে কথা বলে জানান গেছে, এবারের বন্যায় গো-খাদ্যের সংকট ও বন্যার পানিতে বাড়িঘর ভেসে যাওয়ার কারণে অনেক পরিবার তাদের বাড়ির গরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। খড়ের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, বন্যার কারণে চারণ ভূমি নষ্ট এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামতের টাকার জোগান করতেও অনেকে বাড়িতে পোষা গরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বাজারে প্রচুর গরুর সরবরাহ হচ্ছে।
আবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার কোরবানি দিতে না পারায় বাজারে গরু বিক্রিতে এর কিছুটা প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন এই ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। ফলে হাটগুলোতে দেশি গরুর সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও সে তুলনায় বিক্রি কম হচ্ছে বলে হাট ইজারাদার ও ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে বিক্রেতা ও স্থানীয় ব্যাপারিদের দাবি, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ভারতীয় গরু প্রবেশ করায় জেলায় এবার বাইরের জেলা থেকে ব্যাপারিরা আসছেন না। ফলে স্থানীয় লোকদের কোরবানির চাহিদার তুলনায় প্রচুর গরু বাজারে দেখা যাচ্ছে।
উলিপুর হাটের গরুর ব্যাপারি রবিউল এবং সদরের কাঁঠালবাড়ি হাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি আলম জানান, বিগত বছরগুলোতে কোরবানির ঈদের ১০/১৫ দিন আগে থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে ব্যাপারিরা আসতেন গরু কিনতে। কিন্তু এবার বাইরে থেকে ব্যাপারিরা আসছেন না। ফলে এবারের ঈদের বাজারে গরুর দাম ও বিক্রি দুটোই কম।
তাদের কথার সত্যতা মেলে এক গরু বিক্রেতার কাছে। উলিপুরের কাশিম বাজার থেকে উলিপুর হাটে গরু বিক্রি করতে নিয়ে আসা সুলতান মাহমুদ জানান, গত দু‘মাস আগে তার দুটি গরু এক লাখ পঞ্চান্ন হাজার টাকা দাম বললেও ঈদের হাটে সেই গরু দুটোর দাম বলছে এক লাখ ২৫-৩০ হাজার টাকা।
সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘যে দাম বলছে তাতে খরচই উঠবে না।’
দাম কম হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বন্যার কারণে এবার গরুর আমদানি (সরবরাহ) বেশি। আর বাইরের পার্টি (ব্যবসায়ী) না আসার কারণে বিক্রি অনেক কম, দামও কম। একই কথা বলেন আল-আমিন নামে অপর এক স্থানীয় ব্যবসায়ী।
অন্যদিকে জেলার সবচেয়ে বড় গরুর হাট যাত্রাপুর হাট এবং সীমান্তবর্তী উপজেলা ফুলবাড়ীর কয়েকটি হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই হাটগুলোতে বিগত বছরের তুলনায় ভারতীয় গরুর সরবরাহ অনেক কম। সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফ এর কড়া নজরদারি এড়িয়ে স্বল্প সংখ্যক গরু আসলেও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে পরিবহন সমস্যার কারণে বাইরের কোনও ব্যাপারি হাটে আসতে না পারায় বিক্রিও কমে গেছে।
যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, যাত্রাপুর হাটে এবার ভারতীয় গরু আসলেও তার সংখ্যা বিগত বছরের তুলনায় একেবারেই কম। আর বন্যায় ইউনিয়নের সবকটি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাইরের কোনও ব্যবসায়ীরা হাটে আসছেন না, ফলে বিক্রিও অনেক কম।
তবে বাজারে গরুর দাম কম হওয়ায় ক্রেতারা অনেক খুশি। তারা মনে করছেন এবার দামটা অনেক সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। দেশি গরুর সরবরাহ বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তিও দেখা গেছে।
জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল হাই সরকার জানান, জেলায় এবার খামারিদের মাধ্যমে প্রায় ৬৫ হাজার কোরবানির পশু (গরু-ছাগল) বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়াও অনেকে বাড়িতে পালিত গরু-ছাগল বিক্রি করার জন্য হাটে তুলছেন। ফলে জেলার হাটগুলোতে এবার কোরবানির পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে যা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বাইরের জেলাতেও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
‘রাকিব মরে প্রমাণ করলেন তিনি চোর নন’








