ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সৃষ্ট বন্যার কবলে পড়েন নীলফামারীর ৫১ ইউনিয়নের ৪১ হাজার ৫৩৫টি পরিবারের এক লাখ ৪৬ হাজার মানুষ। ওই সময় দুর্গত এলাকার বেশিরভাগ মানুষের ঘরবাড়িই বানের পানিতে ধসে যায়, অনেকের জমির ফসল নষ্ট হয়, কারও কারও আবার ভেসে যায় পুকুরের মাছ। আসন্ন কোরবানির ঈদ নিয়ে তাই ক্ষতিগ্রস্ত এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কোনও উচ্ছ্বাস নেই, নেই কোনও আয়োজন বা তার পরিকল্পনা।
ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়নের ছোট খাতা গ্রামের রমজান আলী (৫৫) বলেন, ‘কষ্ট করি হলেও গেল বারের বন্যার পর হাড়ি (কোরবানি) দিতে পারছিলাম, এবার আর কোনোমতে হাড়ি দেওয়া যায় না। এ্যালাও (এখনও) বাঁধের উপরোত (উপরে) ছাওয়া নিয়া প্ল্যাস্টিক টাঙ্গি (টানিয়ে) আছি। হামার এবার সব গেছি, ব্যাহে (ভাই)। ঘরবাড়ি এখনও ঠিক করির পাই নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘চার বিঘা জমিত আমন ধান নাগাচুনু (লাগিয়েছিলাম), সেটাও বন্যার পানিত তলাইছে। হামরা এ্যালা চলম (চলবো) কেমন করি? টাকার অভাবে ভাঙা ঘর-দোয়ার ঠিক করিবার পাইছিনা।’
একই উপজেলার বাইশপুকুর গ্রামের আবু তাহের (৪৫) বলেন, ‘গত ঈদে পাঁচ হাজার করি টাকা দিয়া সাত জনে হাড়ি দিছোনো। এবার আর পারা যায়ছে না। হাতের অবস্থা ভাল নাই। বাড়ির খরচ যোগার দেওয়াই ভার। হাড়ি কেমন করি দেমো?’
একই কথা জানান তিস্তা বেষ্টিত ডিমলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, গয়াবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের আরও অনেকেই। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্যার পানি নেমে গেলেও এর ক্ষত এখনও তারা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
পূর্ব ছাতনাই কলোনি গ্রামের মহির উদ্দিন (৫৫) জানান, এবার আনন্দের বদলে বেদনা নিয়ে ঈদ হাজির হয়েছে তার পরিবারে। কোরবানি নিয়ে তার কোনও পরিকল্পনাই নেই, আয়োজন থাকা দূরের বিষয়। এলাকার বেশিরভাগ মানুষেরই তার মতো অবস্থা। তাই ঈদের দিন ছেলেমেয়ের পাতে এক টুকরো মাংস পড়ে কি না, তা নিয়েই তিনি সন্দিহান। এদিকে, জামাকাপড় কেনা তো পরের ব্যাপার, লবণ কেনার টাকাও নেই তার পকেটে। বন্যায় তার ঘরবাড়ি ধসে গেছে, পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, পানিতে তলিয়ে পচে গেছে ধানক্ষেতও। একেবারে পথের ভিখারি মতো দশা তার।
এখনও কলম্বিয়া বাঁধে রয়েছেন খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের রেহানা বেগম (৫৬)। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘সরকার হামাক (আমাদের) খালি দশ কেজি চাল দিছে। হামরা (আমরা) আর কিছুই পাইনো না। যায় (যারা) পায় তায় (তারা) বারে বারে পায়, আর যায় পায় না তার খবর কেউ ন্যায় (নেয়) না।’
কয়েকটি ইউনিয়নে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কেনাকাটা নিয়ে ব্যস্ত থাকার এ সময়ে তিস্তা পাড়ের মানুষ ঘরবাড়ি মেরামত নিয়ে ব্যস্ত, অনেকে আবার ব্যস্ত জমির ক্ষেত নিয়ে।
খালিশা চাপানি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার ৫০০ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে অধিকাংশ পরিবারই সরকারি সহায়তা পেয়েছে। তবে ঈদ নিয়ে এসব মানুষের মাঝে কোনও উচ্ছ্বাস নেই। ত্রাণের ব্যবস্থা করলে হয়ত এসব মানুষের মুখে হাসি ফুটতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের ৩২টি পরিবারের বাড়িঘর একেবারে ধসে গেছে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য উপজেলা পর্যায়ে জানানো হয়েছে।’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ৫১টি ইউনিয়নের ৪১ হাজার ৫৩৫টি পরিবারের এক লাখ ৪৬ হাজার ১৪৫ জন মানুষ এখনও বন্যার ক্ষতির ধকল সামলে ওঠতে পারেনি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এটিএম আখতারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৭০০ মেট্রিক টন চাল, ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫২৫ মেট্রিক টন চাল, ১৭ লাখ ৫০০ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ছয় হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ত্রাণ বিতরণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুর্নবাসনে নতুন করে বরাদ্দ আসলে তাৎক্ষণিকভাবেই তা বিতরণ করা হবে।’








