ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষের পর দুটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে দিনাজপুর জেলায় চলমান ধর্মঘটের তৃতীয় দিন চলছে। বাস চলাচল বন্ধের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই ধর্মঘট এখন সর্বাত্মক রূপ নিয়েছে। জেলায় ট্রাক, মাইক্রোবাস, ট্যাংকলরিসহ সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আন্দোলন বেগবান করতে আগামীকাল রবিবার (২৬ নভেম্বর) থেকে রংপুর বিভাগের আট জেলায় পরিবহন ধর্মঘট ডাকার কথা চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
এদিকে, ধর্মঘটের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দিনাজপুর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ-পরিচালককে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। এই কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ইমতিয়াজ হোসেন জানান, তদন্ত কমিটির সদস্যরা এরইমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করবে।
দাবি পূরণের কোনও আশ্বাস না মেলায় শুক্রবার (২৪ নভেম্বর) সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের কার্যালয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি জাহিদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম সেলু, মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম. রফিক, সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী, ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি শহীদুল ইসলাম, ট্রাক্টর শ্রমিক ইউনিয়নের মোজাফফর হোসেন ঝলু, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, ট্রাক ও ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ সময় আন্দোলন বেগবান করতে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, ট্যাংকলরিসহ সব ধরনের যানবাহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম সেলু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দাবি আগুনে পুড়ে যাওয়াসহ ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের ক্ষতিপূরণ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা। কিন্তু এখনও এসব বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত না আসায় জেলায় সর্বাত্মক পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রবিবার থেকে বিভাগের আট জেলায় এই ধর্মঘট ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
এদিকে ধর্মঘটের কারণে বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরা। জেলার ২৩টি রুটের সবগুলোয় যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। গত কয়েকদিন ইজিবাইক, রিকশা, ভ্যান চলাচল করলেও কোনও কোনও জায়গায় এগুলোকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। যান চলাচল বন্ধ থাকায় ট্রেনের ওপর চাপ পড়েছে। সিট না পাওয়ায় ঠেলাঠেলি করে ভিড়ের মধ্যেই ট্রেনে যাতায়াত করতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।
দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার নার্গিস প্রামাণিক বলেন, ‘বাস বন্ধ থাকায় ট্রেনে যাত্রীদের চাপ বেড়ে গেছে। যাত্রীদের সুষ্ঠুভাবে নিয়ে যাওয়ার জন্য সিট না থাকলেও লোকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন।’
উল্লেখ্য, গত বুধবার (২২ নভেম্বর) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বহন করা একটি বাসের সঙ্গে তৃপ্তি পরিবহন নামে একটি বাসের সাইড দেওয়াকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের সঙ্গে ছাত্রদের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে ছাত্ররা এসে মোটর পরিবহন শ্রমিকদের মারধর করে ও বাস ভাঙচুর করে। এ সময় শ্রমিকরাও পাল্টা হামলা চালায়। এতে দুই শিক্ষার্থী ও তিন শ্রমিক আহত হন। আহত হাবিপ্রবি’র ছাত্র নিবিড় ও সৌরভ এবং মোটর পরিবহন শ্রমিক ভোলা, তুহিন ও আফজালকে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই ঘটনার পর দিনাজপুর হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সামনে রাস্তায় বাঁশ ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় তারা তৃপ্তি পরিবহন ও শাহী পরিবহনের দুটি বাস জ্বালিয়ে দেন।
এই ঘটনার পর বুধবার রাত থেকেই দিনাজপুর মোটর পরিবহন শ্রমিক ও দিনাজপুর সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করে। পরিস্থিতি নিরসনে বৃহস্পতিবার বিকালে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম তার সভাকক্ষে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং দিনাজপুর মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন ও জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের নেতাদের নিয়ে এক বৈঠক করেন। তবে কোনও সমঝোতা ছাড়াই আলোচনা ভেস্তে যায়। এরপর রাতে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।








