দেশের প্রতি দায়িত্ব থেকেই প্রতিবছর কর দিয়ে ‘কর বাহাদুর’ উপাধি পেয়েছেন গাইবান্ধা জেলার ব্যবসায়ী আলহাজ আব্দুল হাক্কানি। তিনি বলেন, ‘দেশের একজন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের দায়িত্ব কর দেওয়া। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ ও দায়িত্বশীলতা থেকেই ব্যবসার শুরু থেকে কর দিয়ে আসছি। সবাই ঠিকমতো কর দিলে দেশ এগিয়ে যাবে। যারা কর দেন তারা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন, তারা মহান। দেশের প্রতি দায়িত্ব থেকেই কর দিচ্ছি, তাই দেশ আমাকে আজ স্বীকৃতি দিয়েছে। বাকি জীবনও কর দিয়ে যাবো।’
প্রথমবারের মতো ২০১৬-১৭ করবর্ষে সারাদেশে ‘কর বাহাদুর পরিবার’ স্বীকৃতি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গাইবান্ধা জেলার মধ্যে ‘কর বাহাদুর পরিবার’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন ব্যবসায়ী আলহাজ আব্দুল লতিফ হক্কানির পরিবার। সম্প্রতি বগুড়া কর অঞ্চল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আব্দুল লতিফ হক্কানির হাতে ‘কর বাহাদুর পরিবার’র সম্মননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, বর্তমানে আব্দুল লতিফ হাক্কানীর স্ত্রী, দুই ছেলে, বড় ছেলের বউ ও একমাত্র মেয়েও নিয়মিত কর দিচ্ছেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত অন্য ছয় ভাইও নিয়মিত কর দেন। তাদের মধ্যে স্ত্রী আলহাজ্ব মোছা. সেলিনা আকতারের নামে সার বিক্রির লাইসেন্স আছে, বড় ছেলে শরিফ মো. সুমন হক্কানি মাস্টার্স শেষ করে বাবার ব্যবসা দেখাশুনা করছেন, ছোট ছেলে ওয়াশিকার মো. ইকবাল (নয়ন হক্কানি) ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জনিয়ারিং পড়ার পাশাপাশি বাবার ব্যবসা দেখছেন। এছাড়া একমাত্র মেয়ে তাসনিম আকতার লুসির জামালপুর জেলার সরিসাবাড়ির উপজেলার বাসিন্দা মো. আবদুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। স্বামী আব্দুর রহমান বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলা জজ আদালতের সিনিয়র সহকারী জেলা জজ।
আরও জানা গেছে, ১৯৫০ সালের দিকে লতিফ হক্কানির বাবা আব্দুর রাজ্জাক হক্কানি গ্রাম থেকে শহরে বসবাস শুরু করেন। তার বাবা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পরের বছর তিনি বিএ পাস করেন। আব্দুল লতিফ হক্কানি ১৯৭৪-১৯৭৫ বাবার হাত ধরেই ব্যবসায় আসেন। ১৯৮০ সালের শেষের দিকে তিনি নিজে ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স পাওয়ার পর সার ও ইট ভাটার ব্যবসা শুরু করেন।
কর বাহাদুর পরিবার নির্বাচিত হওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় আব্দুল লতিফ হক্কানি বলেন, ‘সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে মানুষের কল্যাণে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছি। এই বয়সে এ সম্মাননা পেয়ে আমি খুবই খুশি ও আনন্দিত। এখন থেকে আরও উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবো। তাছাড়া আমার এ অর্জন নানা শ্রেণি পোশার মানুষকে কর দিতে অনুপ্রাণিত করবে। তাই দেশের স্বার্থে, উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে কর দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার আহবান জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৮৩-১৯৮৪ অর্থবছরে প্রথম পাঁচ হাজার টাকার কর দিয়েছিলাম। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতি অর্থবছরে কর দিয়ে আসছি। চলতি ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে আমি ৩৭ লাখ টাকা কর দিয়েছি। এরআগে, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ৪৪ লাখ, ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ৪৭ লাখ টাকার কর দিয়েছি।’
প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হওয়ায় হক্কানি পরিবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। বিভিন্ন এলাকার গরীব-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে পরিবারটি। বিশেষ করে অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া, গরীব-অসহায় পরিবারের মেয়েদের বিবাহ দেওয়ার ব্যবস্থা করা এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এছাড়াও তাদের সহযোগিতায় অনেক ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
বগুড়া কর অঞ্চলের আওতাধীন গাইবান্ধা কর বিভাগের সহকারী কর কমিশনার মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘গাইবান্ধা জেলায় এবার সর্বোচ্চ করদাতা তিন জন, দীর্ঘমেয়াদী করদাতা দুই জন, তরুণ উদ্যোক্তা একজন এবং দীর্ঘমেয়াদী নারী করদাতা একজনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। আর ‘কর বাহাদুর’ পরিবারের স্বীকৃতি পেয়েছেন আব্দুল লতিফ হক্কানির পরিবার।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবারের করবর্ষে জেলার এক হাজার ৫৭৩ জন আয়কর রির্টান জমা দিয়েছেন। ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলায় আয়কর রির্টান জমাদানকারীর সংখ্যা হবে প্রায় চার হাজার। গত করবর্ষে যা ছিল সাড়ে তিন হাজার। গত বছর জেলায় কর আদায়ের লক্ষমাত্রা ধরা হয় ২৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এরমধ্যে আদায় হয় ২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এছাড়া চলতি করবর্ষে কর আদায়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩৬ কোটি ৪১ লাখ।’
জেলার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ, ব্যবসায়ী-চাকরিজীবীদের করের আওতায় নিয়ে আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে করের আওতায় নিয়ে আসতে উপজেলা পর্যায়ে উন্মুক্ত সভা-সেমিনাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। এছাড়া স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানকে কর দিতে ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। তবে গত অর্থ বছরের তুলনায় এ বছর করদাতা ও করের পরিমান বেড়েছে। আগামীতে জেলায় আরও করদাতার সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছি।’








