তিস্তা নদী পারের ধু-ধু বালুচরে এখন সবুজের উৎসব। মিষ্টি কুমড়ার লতা তার ঢলঢলে পাতা ছড়িয়ে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিছিয়ে গেছে। নিবিড় সবুজের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে ছোট-বড় নানা আকারের কুমড়া। এরমধ্যে কোনও কোনোটি পাকতে শুরু করেছে, কোনও কোনোটি আবার পেকে উঠেছে। পেকে ওঠা ও পাকতে শুরু করা কুমড়াগুলোর গায়ে নীলচে আভা, যা দেখলে যে কারও চোখ জুড়িয়ে যাবে।
এ দৃশ্য রংপুরের কাউনিয়ার তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে। এখানকার পতিত জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছে প্রায় ১শ’ ২০টি পরিবার। এই পরিবারগুলো বেশ কয়েক বছর ধরেই চরাঞ্চলের পতিত জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ করে আসছে। আর মিষ্টি কুমড়া চাষ করে তাদের অভাব-অনটন ঘুচেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে কুমড়া চাষকারী পরিবারগুলো এখন স্বাবলম্বী। তাদের ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরের জায়গায় এখন পাকা ঘর উঠেছে।
চাষিরা জানান, চরাঞ্চলে কুমড়া চাষ করে বছরে তারা দুই থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। কুমড়া বিক্রির আয় থেকে তাদের সংসার ও সন্তানদের পড়াশুনার খরচ চলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কাউনিয়ার তিস্তা নদী পারের পাঁচ কিলোমিটারের চরাঞ্চলে ধু ধু বালুচর। এর মধ্যে কিছু কিছু এলাকায় আবার সবুজের প্লাবন। আর এই নিবিড় সবুজের ভেতর ছোট-বড় মিষ্টি কুমড়া শোভা যাচ্ছে।
রাধা রানী নামে এক চাষি জানান, চলতি বছর তিনি ও তার স্বামী মিলে ১৮০টি গর্ত খুঁড়ে মিষ্টি কুমড়ার বীজ বপন করেন। প্রতিটি গর্তে এখন ৩-৫টি করে মিষ্টি কুমড়া ধরেছে, যার প্রতিটির ওজন ৫ কেজি। এ কাজে তাদের সন্তানরাও সাহায্য করেছে।
তিনি আরও জানান, এবার কুমড়া চাষে তাদের একলাখ ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। তবে তার আশা, এবার তিনি প্রায় পাঁচ লাখ টাকার কুমড়া বিক্রি করতে পারবেন। এতে তার অন্তত তিন লাখ টাকা আয় হবে।
সালমা বেগম নামে এক বিধবা জানান, তিনি এবার মাত্র ৩০টি গর্ত খুঁড়ে মিষ্টি কুমড়া চাষ করেন। এরমধ্যে দেড় শতাধিক কুমড়া ধরেছে। তার সন্তানরাও এ কাজে তাকে সাহায্য করেছে। তার খরচ হয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা। তার আশা, দেড়শ’ কুমড়া বিক্রি করলে তার কমপক্ষে ৭-৮ হাজার টাকা লাভ হবে। আগামীতে আরও বেশি পরিমাণে কুমড়া চাষ করবেন বলেও জানান তিনি।
শুধু রাধা রানী বা সালমার পরিবার নয়; তাদের মতো কাউনিয়ার আরও অন্তত ১২০টি পরিবার এভাবে গর্ত খুঁড়ে কুমড়া চাষ করেছে।
চাষিরা জানান, দেশে কৃষি জমি কমছে। তিস্তা নদী পারের চরাঞ্চলের জমি বছরের প্রায় সাত মাস পতিত থাকে। এ সময় এখানে অনায়াসে মিষ্টি কুমড়া চাষ করা যায়।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, কেবল দেশ নয়; বিদেশেও মিষ্টি কুমড়ার চাহিদা রয়েছে। সেজন্য তিস্তা নদীর চরাঞ্চলের ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষাবাদের লক্ষ্য নিয়ে তারা কাজ করছেন।
কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তা জানান, চরে তিন ফুট গর্ত খুঁড়ে তাতে প্রথমে গোবর ও রাসায়নিক সার দেওয়া হয়। এরপর গর্তে কুমড়ার বীজ বপন করা হয়। এরপর এসব গর্তে প্রতিদিন পানি দিতে হয়। এজন্য কৃষকরা চরে বড় গর্ত করে তাতে নদী থেকে পানি এনে জমা রাখেন। ৪-৬ মাসের পরিচর্যায় কুমড়াগুলো বড় হয়ে ওঠে।
চাষিরা জানান, বড় হলে প্রত্যেকটি কুমড়ার ওজন ৪-১২ কেজি পর্যন্ত হয়। পরে তা বাজারে কেজি প্রতি ৮-১০ টাকায় বিক্রি করা যায়। আর পাইকারদের কাছে বিক্রি করলে তারা কুমড়াপ্রতি ৩০-৮০ টাকা পর্যন্ত পান।
চাষিরা জানান, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড থেকে তাদের পরামর্শ দেওয়াসহ নানা সহযোগিতা করা হয়।
কৃষি কর্মকর্তা জানান, এখানকার কুমড়াক্ষেত দেখতে সম্প্রতি নেপাল ও ভুটানের কৃষি বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন নেপালের কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা মিসেস ম্যানিলা খারেল ও ভুটানের কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা মিসেস তাইওয়ান। তারা অল্প সময়ে এতো বড় বড় কুমড়া চাষ হয় দেখে অভিভূত হয়ে গেছেন। যাওয়ার আগে তারা এ ব্যাপারে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের নানান পরামর্শ দিয়ে গেছেন।
মিসেস ম্যানিলা খারেল ও মিসেস তাইওয়ান এ প্রতিবেদককে জানান, তাদের দেশেও তিস্তার মতো নদী আছে, যেগুলোতে বছরের অধিকাংশ সময় পানি থাকে না। ওই সব নদী পারের চরাঞ্চলে তারাও কুমড়া চাষ করবেন। তিস্তা পারের চরাঞ্চলে উৎপাদিত কুমড়া দিয়ে নানা ধরনের জেলি ও জুস তৈরি করে তা বিপণনের ব্যবস্থা করলে যে কেউ লাভবান হবেন বলেও জানান তারা।
অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিসেস হাসিন জাহান জানান, চরাঞ্চলে মিষ্টি কুমড়া চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। এখন প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সহায়তা। এতে তিস্তার ৪০ হাজার হেক্টর বালুচরকে চাষযোগ্য জমিতে পরিণত করা যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক শাহ আলম জানান, চরাঞ্চলে মিষ্টি কুমড়া ও উন্নত জাতের ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।








