শ্রীমতি ঠগি রানী, বয়স ১০০ বা তার বেশি। বয়সের ভারে কোমর বেঁকে গেছে, চলার শক্তি নাই। শরীরের চামড়া কুঁচকে গেছে। এই বয়সেও তিনি বয়স্ক ভাতা পাননি। নীলফামারীর জলঢাকা পৌর এলাকার সবুজ পাড়া বটতলি এই শতবর্ষী নারীর প্রশ্ন, আর কত বয়স হলে তিনি ভাতা পাবেন। আক্ষেপের সুরে ঠগি রানী বলেন, ‘৩০ বছর আগত (আগে) স্বামী মইছে। চারটা ছোওয়া (সন্তান) মোর। তিনটা বেটি, একটা ব্যাটা। বেটি (মেয়ে) দু’টা স্যালায় (তখনই) মরি গেইছে। একটা ব্যাটাটা (ছেলে), একটি বেটি দুনিয়াত (পৃথিবী) বাঁচি আছে। ব্যাটাটার (ছেলে) ডান চোখ কানা (অন্ধ)। অতে পানের দোকান করি খায়। এই বয়সে মুই চলির পাংনা (পারি না)। ম্যালা আগাত শুনছু সরকার নাকি বয়স্ক ভাতা দেয়,বয়স হইলে। মোর আর কত বয়স হইলে মুইও (আমি) বয়স্ক ভাতা পাইম।’
ছল ছল চোখে কথাগুলো বললেন ঠগি রানী। প্রথমে তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। কারণ অনেকেই কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কথা রাখেননি। বয়সের কারণে তার কথাও ঠিকমতো বোঝাও যায় না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন এবং চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ঠগি রানীর ছেলে মহেষ বর্মনের (৭৬ )। তিনি এক চোখে দেখতে পান না। আরেক চোখেও ছানি পড়েছে।
মহেষ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা চার ভাইবোন। দুই বোন মারা যায়। বেঁচে আছি আমি আর আমার বোন কুলো বালা। তবে এ বাঁচা মৃত্যুর মতো। অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হয়েছি। দুটো চোখেরই সমস্যা। একটি একেবারে অন্ধ। আর একটি ছানি পড়া। কোনও রকমে ওটা দিয়ে কাটা (খিলি) পানের দোকান করি। ওই দোকান দিয়ে কোনও রকমে সংসার চালাই। এই রোজগার দিয়ে সংসারের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। তারওপর বৃদ্ধা মাকে দেখাশুনা করতে হয়। মায়ের খাবার, ওষুধের ব্যবস্থা করতে হয়। সরকারের দেওয়া কোনও সুযোগ-সুবিধা পাইনি।’
তিনি বলেন, এমপি হতে শুরু করে স্থানীয় চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর ও সমাজসেবা অফিসে ধর্ণা দিয়েছি। তাতে কোনও ফল হয়নি। বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। আর বলে ধৈর্য ধরতে হবে।
মহেষ বলেন, ‘যাদের লোক আছে তারা ৬০ বছরের আগেই বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা পেয়েছে। আমাদের লোক নেই তাই পাইও না। আমার মায়ের বয়স প্রায় ১১০ বছর। এ পর্যন্ত কেউ কোনও খোঁজ-খবর রাখেনি।’
এলাকাবাসীর মতে, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তাদের দৃষ্টিগোচর হলে হয়তো একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড দিয়ে উপকৃত হতে পারে এ পরিবারটি।
ঠগি রানী বলেন, ‘বয়স হইছে। কোন দিন যে মরণ হয় জানো না। এককান বয়স্ক ভাতার কার্ড পাইলে মরিয়া শান্তি পানু হায়।’
ওই এলাকার কমিশনার ফজলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে জলঢাকা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মনিমুন আকতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই বৃদ্ধা কোনও সময় বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য আমার অফিসে আসেনি। বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তার কার্ড করে দেওয়া হবে। বরাদ্দ পেলে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কার্ড দেওয়া হবে।’








