কাস্টমসের সার্ভার বন্ধ থাকায় দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা চাল বাজেটের আগে খালাস করতে পারেনি আমদানিকারকরা। ফলে তাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি শুল্ক। এ কারণে আমদানিকারকরা চাল খালাস বন্ধ রেখেছে। চতুর্থ দিনের মতো চাল খালাস বন্ধ রাখায় বন্দরে প্রায় ৮ হাজার টন চাল আটকা পড়েছে। অন্যদিকে আগের নিয়মে শুল্ক পরিশোধ করে বন্দর থেকে চাল খালাসের জন্য আবেদন জানিয়ে কাস্টম ও এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে আমদানিকারকরা। অন্যথায় আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।
গত ৭ জুনের বাজেটে চালের শুল্ক ২ ভাগ থেকে বাড়িয়ে ২৮ ভাগ করা হয়েছে।
হিলি স্থলবন্দর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক চাল নিয়মিত আমদানি করা হতো। বন্দর দিয়ে ৪ জুন ২৯টি ট্রাকে ১ হাজার ৬২টন চাল আমদানি হয়েছিল, সেখানে ৫ জুন ১০৯টি ট্রাকে ৩ হাজার ৮৪৮টন চাল আমদানি করা হয়েছে এবং ৬ জুন ২৩৮টি ট্রাকে ৮ হাজার ৩৮০টন চাল আমদানি করা হয়েছে। ৭ জুন বন্দর দিয়ে ৫ ট্রাকে ১৭৫ টন চাল আমদানি করা হয়েছে। বাজেট পেশের আগে গত দুদিনে বন্দর দিয়ে প্রায় ১২ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার টন চাল কম শুল্কে ছাড় করতে পারলেও বন্দরে আটকা পড়েছে প্রায় ৮ হাজার টন চাল।
হিলি স্থলবন্দরের চাল আমদানিকারক মামনুর রশীদ লেবু ও হারুন উর রশীদ হারুন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গত ৪ জুন এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহম্মেদ জানান, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য মজুত রয়েছে। কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্য মূল্য পায় সে জন্য সরকার এবারের বাজেটে চাল আমদানির ওপর আগের মতো ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এ ঘোষণার পর যাদের চালের এলসি খোলা ছিল এবং চালের ট্রাক পাইপলাইনে ছিল তারা ৫ ও ৬ তারিখের মধ্যে তা বন্দরে ঢুকিয়ে খালসের চেষ্টা করে। কিন্তু বাজেটের আগের দিন ৬ জুন বুধবার ও বাজেটের দিন ৭ জুন বৃহস্পতিবার সার্ভার বন্ধ থাকায় তারা চালগুলো খালাস করতে পারেনি। এর ওপর শুক্রবার ছুটি থাকায় কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ফলে তাদের পণ্যগুলো তিন দিন আটকা ছিল। তবে বাজেটের আগের দিন বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত যারা বিলঅবএন্ট্রি দাখিল করতে পেরেছে তারা প্রায় ৪ হাজার টন চাল খালাস করেছে। এছাড়াও আমাদের প্রতিদিন ভারতীয় ট্রাকগুলোর জন্য ২ হাজার টাকা করে গুনতে হচ্ছে। অপরদিকে বন্দরের চার্জও দ্বিগুণ বাড়ছে।
তারা আরও বলেন,‘আমরা বাজেটের আগে চালগুলো আমদানি করেছি। এখন সেই চালের ওপর যদি বাড়তি শুল্ক পরিশোধ করতে হয় তাহলে দুঃখজনক। বাড়তি শুল্ক পরিশোধ করতে হলে আমরা লোকশানের মুখে পড়বো। আমরা বাজেটের আগে চাল আমদানি করে কেন বাজেটের পরের রেটে শুল্ক পরিশোধ করবো। আগের মতো ২ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করে চাল খালাসের জন্য এরইমধ্যে হিলি কাস্টমস, রংপুর কমিশনারেট ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরসহ বিভিন্ন দফতরে আবেদন করা হয়েছে। এর কোনও ফলাফল না আসলে কাস্টমসের এমন আদেশের বিপরীতে আমরা আদালতে যাব।
এ ব্যপারে হিলি স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মুশফিকুর রহমান চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান,বাজেট ঘোষণার আগে আমাদের কোন দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। অন্যান্যবার বাজেটের আগে ও পরে সার্ভার বন্ধ থাকার কথা জানিয়ে নোটিশ দেওয়া হলেও এবারে তা দেওয়া হয়নি। আমাদের কোনও কিছু জানানো হয়নি। প্রতিবারের মতো এবারও যথারিতী ৪, ৫ ও ৬ নং বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত চালের ট্রাক ঢুকেছে। আমদানিকৃত চাল খালাসের জন্য ৬ জুন দুপুর ১২টার মধ্যে প্রায় ৭৫টি বিলঅবএন্ট্রি কাস্টমসে জমা হলেও কাস্টমসের সার্ভার এত ধীরগতি ছিল যে মাত্র ২৯টি বিলঅবএন্ট্রি দাখিলের পর বাকিগুলো আর দাখিল করা যায়নি। এর পর হঠাৎ করে বিকেল ৩টা থেকে সার্ভার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপরে আর কোনও পণ্যের বিলঅবএন্টি দাখিল করা যায়নি।
হিলি স্থলবন্দরে খালাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ভারতীয় ট্রাকের চালকরা বলেন,‘আজ এক সপ্তাহ হতে চললো কারো কারো দশদিন চলেছে কিন্তু এখন পর্যন্ত চাল খালাস হচ্ছে না। কোন পার্টি আসছে না আমরা সাথে যে খরচ বাবদ টাকা নিয়ে এসেছিলাম সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা খাওয়া দাওয়া নিয়ে বিপাকে পড়েছি।’
হিলি স্থলবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বর্তমানে হিলি স্থলবন্দরে প্রায় ৮ হাজার টন চাল নিয়ে ২১৫টি চালবাহী ট্রাক আটকা আছে। চালের আমদানিশুল্ক বৃদ্ধির জন্য আমদানিকারকরা চালগুলো খালাস করতে পারছে না। আগামী দু এক দিনের মধ্যে চালগুলো খালাস না করা হলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কারণ সামনে ঈদের জন্য বেশ কিছু দিন বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। চালগুলো নষ্ট হলে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
হিলি স্থলশুল্কস্টেশনের ডেপুটি কমিশনার রেজভী আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হিলি স্থলশুল্ক স্টেশনের সব কার্যকম জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর নিয়ন্ত্রিত। অ্যাসাইকোডা ওয়ার্ল্ড সার্ভার দ্বারা অনলাইনের মাধ্যমে বিলঅবএন্ট্রি সাবমিট থেকে শুরু করে পণ্যের পরিক্ষণ শুল্কায়ন ও আউটপাশ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে হিলি শুল্কস্টেশনের কোনও কিছু করার থাকে না। সারাদেশের সব কাস্টমসের কার্যক্রম এভাবেই পরিচালিত হয়ে থাকে। গত বছরের বাজেটে চালের আমদানি শুল্ক ২ভাগ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এবারের বাজেটে চালের আমদানি শুল্ক ২ ভাগ থেকে বাড়িয়ে ২৮ ভাগ নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭ জুন সংসদে বাজেট পেশের কারণে ৬ জুন বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সিসটেম আপডেট করা হয়। এ কারনে কেন্দ্রিয়ভাবে সার্ভার বন্ধ রাখা হয়েছিল। ৭ তারিখ বিকেলে সার্ভার ওপেন হয়েছে। এখন যারা বিলঅবএন্টি সাবমিট করবেন তারা দ্রুত চাল খালাস করে নিতে পারবেন। তবে তা নতুন আরোপিত ২৮ ভাগ শূল্কে খালাস করতে হবে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে তাদের কাছে আবেদনের বিষয়টিও তিনি স্বীকার করে বলেনে, আগের ২ ভাগ শুল্কে চাল ছাড় দেওয়ার কোনও সুযোগ এখন নেই কারণ সার্ভারে নতুন আরোপিত শুল্ক সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে।








