লালমনিরহাট ও রংপুরের পাঁচটি ইউনিয়নের ১৬টি ওয়ার্ড তিস্তা নদীর ভাঙনে বিচ্ছিন্ন হয়ে সীমানা জটিলতায় সরকারি-বেসরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সেখানকার প্রায় ১৫ হাজার পরিবার। পরিবারগুলো শিক্ষা, উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য সেবাসহ সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক বন্যায় তিস্তা নদীর ডান তীরে বিনবিনা ও শংকরদহ এলাকার একটি বালুর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে এলাকাবাসীর। এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয়রা।
তিস্তা নদীতে দ্বিখন্ডিত ইউনিয়নগুলো হলো– লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর; আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা এবং রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ও লক্ষীটারী। সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, তিস্তার ভাঙনে লালমনিরহাট সদরের রাজপুর ইউনিয়নের ১, ২, ৩ নম্বর ওয়ার্ড রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া, শহীদবাগ ও হারাগাছ ইউনিয়নের সীমানার সঙ্গে মিশে গেছে। একইভাবে খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের ৪, ৫, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিচ্ছিন্ন হয়ে তিস্তা নদীর ওপারে হারাগাছ ইউনিয়নের সীমানার সঙ্গে মিছে গেছে। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের ৭, ৮, ৯ নম্বর ওয়ার্ড তিস্তা নদীর ওপারে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা, মর্নেয়া ইউনিয়নের সীমানার সঙ্গে মিশে গেছে। অপরদিকে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের ১ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড তিস্তা নদীর এপারে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়ন তুষভাণ্ডারের সীমানার সঙ্গে মিশে গেছে। গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষীটারী ইউনিয়নের ১, ২, ৩, ৬, ৮, ৯ নম্বর ওয়ার্ড তিস্তা নদীর এপারে কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের সীমানার সঙ্গে মিশে গেছে।
এদিকে সাম্প্রতিক বন্যায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা ও লক্ষীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ এলাকায় তিস্তা নদীর ডান তীরে ‘স্বেচ্ছাশ্রম হুমায়ুন’ বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে লক্ষীটারী, কাকিনা ও মহিষখোঁচা ইউনিয়নে। তিস্তার পানি ঢুকে এসব ইউনিয়নের কয়েক হাজার একর ফসলি জমিসহ শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তিস্তার পানিতে বালু ঢুকে নষ্ট হচ্ছে আবাদি জমি।
লক্ষীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুলাহ আল হাদী বলেন, ‘ বন্যা ও ভাঙনে শতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। কয়েক হাজার একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। এসব থেকে রেহাই পেতে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর উত্তর প্রান্তের দিকে সেতুর পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ১০ কিলোমিটার করে একটি বড় বাঁধ নির্মাণ করা গেলে হয়তো ফসলি জমির পাশাপাশি লোকজনের ঘরবাড়ি রক্ষা করা সম্ভব হবে।’
কোলকোন্দ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল বাতেন ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নুরন্নবী ভুট্ট বলেন, ‘আমরা কালীগঞ্জের তুষভাণ্ডার বাজারেই সবকিছু কেনাবেচা করি। শুধু জায়গা জমি কেনাবেচা, সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিতে তিস্তা নদীর ওপারে গঙ্গাচড়া উপজেলায় গিয়ে কাজ সেরে আসি। আর ভোটের সময় ভোট দিই। স্বাস্থ্যসেবা ও লেখাপড়াসহ সবকিছু কালীগঞ্জেই নিতে হয়। আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। রাস্তা-ঘাটের বেহাল দশা। যদি আমরা কালীগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি তাহলে এসব সমস্যা আর থাকবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ভাবনা-চিন্তা করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
রাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন ও মহিষখোঁজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরি বলেন, ‘তিস্তার ওপারের লোকজনকে আমরা সবধরণের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছি না ভৌগলিক সমস্যার কারণে। হয় নৌকায় ওপাশে গিয়ে তাদের সেবা দিয়ে আসতে হয়। না হয় তো নৌকায় তাদেরকে এপাশে এসে সেবা নিতে হয়। এসব লোকজনের দুর্ভোগ কমাতে চাইলে তিস্তার এপারে যারা থাকেন তাদের লালমনিরহাটের সঙ্গে এবং ওপারে যারা থাকেন তাদের রংপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা ছাড়া বিকল্প কোনও উপায় নেই।’
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল হাসান বলেন, ‘সাম্প্রতিক বন্যায় তিস্তার ডান তীরে বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে জানতে পারি এলাকাটি তুষভাণ্ডার ইউনিয়নের নয়। মাঝখানে তিস্তা নদী। গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের ১ নম্বর ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড দুইটি সম্পূর্ণ এপারে কালীগঞ্জের তুষভাণ্ডার ইউনিয়নের সীমানার সঙ্গে মিশে গেছে। এসব লোকজন প্রশাসনিক অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। সীমানা পরিবর্তন করে এসব লোকজনকে কালীগঞ্জের আওতাভুক্ত করা যায় কি– না বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবো।’
লালমনিরহটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আমিনুর রহমান বলেন, ‘তিস্তা নদী তীরবর্তী লোকজনের দুর্ভোগ কমানোর জন্য সরকারিভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে তিস্তার বাঁধ নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। বরাদ্দ না পাওয়ায় বাঁধটি নির্মাণ করা যাচ্ছে না বলে তারা জানিয়েছেন।’








