পঞ্চগড়ে গত কয়েক দিনে পাঁচ থেকে ছয় ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বিরাজ করছে। যা দেশের সর্বনিম্ম তাপমাত্রা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। ঘন কুয়াশা না থাকলেও শৈত্যপ্রবাহে তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে। তীব্র শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলার জনজীবন। বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। সরেজমিনে ঘুরে এবং স্থানীয় ও আবহাওয়া অফিসের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, হিমালয় থেকে আসা হিমেল হাওয়ায় জনজীবন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। শ্রমজীবী মানুষ কাজে যেতে না পারায় পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন যাপন করতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় দরিদ্র, অসহায়, ছিন্নমূল ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। হাঁড় কাঁপানো শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে খড়খুটো জ্বালিয়ে শীত নির্বারণের চেষ্টা করছেন তারা। শীতের তীব্রতায় রাতে ঠিক মতো ঘুমাতে পারছেন না মানুষ। যানবাহনগুলোকে সকালের দিকেও হেডলাইট জ্বালিয়ে সাবধানে চলাচল করতে হচ্ছে।
শীতের তীব্রতা বাড়ার কারণে প্রতিদিনই পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে বাড়ছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিন এই হাসপাতালে শীতজনিত রোগীরা ভর্তি হচ্ছেন। গত দুদিনে প্রায় ৫০ জন শিশু ও বৃদ্ধ পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ রকম চিত্র জেলার অন্য হাসপাতালগুলোতেও।
জেলার বোদা উপজেলার আমতলা কাজীপাড়া এলাকার গৃহবধূ জোসনা বেগম কোলের শিশুকে নিয়ে এসেছেন পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে। দুইদিন ধরে পাতলা পায়খানা হচ্ছে। এ কারণে চিকিৎসক তাদের হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছেন। শিশুর নিউমোনিয়ার কারণে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি আছেন জেলার সদর উপজেলার হাড়িভাসা এলাকার গৃহবধূ আকলিমা বানু।
অতিরিক্ত শীতের কারণে সন্তানের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। তাই গত দুদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন জেলার সদর উপজেলার ধাক্কামারা এলাকার আমেনা বেগম।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. প্রতীক কুমার বনিক জানান, শৈত্যপ্রবাহের ফলে এখানে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। ফলে অন্য সময়ের তুলনায় এখনকার হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।’ শিশুদের বাঁশি খাবার পরিহার করা, পরিষ্কার ও ফুটানো পানি পান করানোর জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি এই শীতে শিশু ও বৃদ্ধদের গরম রাখার জন্য পরিবারের সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
জেলা শহরের নিমনগর এলাকার দিনমজুর আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়া আমার মতো দিন মজুরকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। আমরা তো ঘরে বসে থাকতে পারি না। কাজ না করলে অনাহারে থাকতে হয়।’
জেলা শহরের মসজিদপাড়া এলাকার বাসিন্দা রিপন হোসেন বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। কুয়াশা না থাকায় শীতের পরিমাণ বাড়ছে।’
শহরের নতুনবস্তি এলাকার রিকশা-ভ্যান চালক সলেমান বলেন, ‘সকালে বের হলে কিছু রোজগার হয়। কিন্তু গত ৫-৬ দিন ধরে ঠাণ্ডার কারণে সকালে রিকশা চালাতে পারছি না। রাস্তাঘাটেও লোকজন তেমন চলাচল করছেন না। যাত্রী না থাকলে ইনকামও হয় না। আয় করতে না পারায় গোটা পরিবারেকে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।’
নাইট কোচ চালক আব্বাস আলী বলেন, ‘শীতের সময় গাড়ি চালাতে কষ্ট হয়। কোনও কোনও দিন কুয়াশা বেশি হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে গাড়ি চালাতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে। অধিকাংশ সময় দিনের বেলায়ও হেডলাইট জ্বালিয়ে যাতায়াত করতে হয়।’
পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র তৌহিদুল ইসলাম জানান, পৌর এলাকায় ২০ হাজারেরও বেশি অসহায়, ছিন্নমূল ও দুঃস্থ মানুষ বসবাস করেন। শীতে সামান্য কম্বল পেয়েছি, তা ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিদিন শত শত শীতার্ত লোক পৌরভবন ও বাসায় ভিড় করছে। শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন শিশু ও বৃদ্ধরা।
তেতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গত ছয়দিন ধরে দেশের সর্বনিম্ম তাপমাত্রা বিরাজ করছে পঞ্চগড়ে। বৃহস্পতিবার (৩ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় ৫ দশমিক ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। যা দেশের সর্বনিম্ম তাপমাত্রা ছিল। পঞ্চগড় হিমালয় কাছে হওয়ায় হিম শীতল বাতাস এ এলাকায় আসে। ফলে এখানে তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত কমছে। কুয়াশা না থাকায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এ কারণে তাপমাত্রাও কমছে। ’








