লালমনিরহাটে কৃষকদের অজ্ঞতা ও অসচেতনা কারণে উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষি জমিগুলো। এখানে গড়ে উঠা ইটভাটাগুলোর মালিকরা কৃষকদের কাছে থেকে টপ সয়েল (জমির উপরিভাগের দুই ফুট মাটি) কিনে নেওয়ার ফলে একদিকে জমিগুলো উর্বরতা হারাচ্ছে অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বিধু ভূষণ রায় বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন,‘আবাদি জমির টপ সয়েল কেটে নেওয়ার ফলে জমির উর্বরতা যেমন কমে যাবে তেমনি কাঙ্ক্ষিত সফল উৎপাদন হবে না।’
অন্যদিকে জমি থেকে কেনা মাটি ট্রলিতে (ট্রাক্টর) করে পরিবহনের কারণে স্থানীয় রাস্তা-ব্রিজ ও কালভার্টগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ নিয়ে ইটভাটার মালিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জন্য লালমনিরহাট স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আমিরুজ্জামান জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে,লালমনিরহাটে মোট ৪৭টি ইটভাটার মধ্যে ৩৭টির লাইসেন্স আছে। তারমধ্যে চলতি অর্থবছরের হালনাগাদ কাগজপত্র রয়েছে মাত্র ১৬টি ইটভাটার। ১টি ইটভাটা বন্ধ রয়েছে।
এরমধ্যে পাটগ্রাম উপজেলার মোট ৪টি ইটভাটার মধ্যে ৩টির কাগজপত্র হালনাগাত রয়েছে। হাতীবান্ধা উপজেলার মোট ১৬টি ইটভাটার মধ্যে ৯টির লাইসেন্স আছে। এরমধ্যে ৩টির কাগজপত্র হালনাগাদ করা হয়েছে। এছাড়া ৯টি ইটভাটার মালিক জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের ওপর হাইকোর্টে মামলা করেছেন। কালীগঞ্জ উপজেলার মোট ৮টি ইটভাটার মধ্যে ২টি ইটভাটার কাগজপত্র হালনাগাদ রয়েছে। চলতি অর্থবছর ৩টি ইটভাটার মালিক অগ্নিসংযোগের অনুমতি পাননি। বাকি ৩টি ইটভাটার মালিক জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের ওপর হাইকোর্টে মামলা করেছেন। আদিতমারী উপজেলার মোট ১১টি ইটভাটার মধ্যে ৯টির লাইসেন্স আছে। এর মধ্যে চলতি বছর ৪টি ইটভাটার কাগজপত্র হালনাগাদ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে একটি এবং ৩টির মালিক জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের ওপর হাইকোর্টে মামলা করেছেন।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কালীগঞ্জ উপজেলার গোড়ল এলাকার মেসার্স এসএ ব্রিকসের মালিক মো. শহিদুল ইসলাম চলতি অর্থবছর ইট পোড়ানোর অনুমতি পাননি। তারপরও থেমে নেই তার ইটভাটার কাজ। পুরোদমে ইট উৎপাদন করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতি না পাওয়ায় চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট করেছি। এ কারণেই ইটভাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
অপরদিকে হাতীবান্ধা উপজেলার মেসার্স জেএস ব্রিকসের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা আহমেদ আলী বলেন,‘নতুন নীতিমালা অনুযায়ী পরিবেশ অধিফতরের লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অন্যদের মতো আমরাও হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেছি।’
জমির ওপরের মাটি বিক্রির কারণে তার জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এরপরও তিনি কেন বিক্রি করছেন জানতে চাইলে জমির মালিক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। কৃষি অফিসারও এ ব্যপারে আমাদের কিছু বলেনি। এবার আমি ২৪ শতক জমির মাটি ৪ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। তারা আমার জমির ২ ফুট মাটি কেটে নিবে।’
এব্যাপারে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিধু ভূষণ রায় বলেন,‘ইটভাটার সবকিছু দেখভাল করে থাকে জেলা প্রশাসন। কৃষক তার জমির মাটি বিক্রি করে দিলে আমাদের কি করার আছে। তারপরও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখে কৃষকদের সামনে ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরাসহ সচেতনতা সৃষ্টির নির্দেশ দেওয়া হবে।’
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন,‘জেলার পাঁচ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ইটভাটার কারণে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া জেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ মাঠ পর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তথ্য পেলে সংশ্লিষ্ট ইটভাটা মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ আরও বলেন,‘লালমনিরহাটে মোট ৪৭টি ইটভাটার মধ্যে ৩৭টির লাইসেন্স আছে। তারমধ্যে চলতি অর্থবছরের হালনাগাদ কাগজপত্র রয়েছে মাত্র ১৬টি ইটভাটার। ১টি ইটভাটা বন্ধ রয়েছে। ১০টি ইটভাটার বৈধ কোনও কাগজপত্র নেই। এছাড়া হাইকোর্টে মামলা থাকায় লাইসেন্সধারী ১৪টি ও লাইসেন্স নেই এমন ৪টিসহ মোট ১৮টি ইটভাটা মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।’








