দিনাজপুরে বীরগঞ্জ উপজেলার গড়েয়া কুড়িটাকিয়া গ্রামে মেলার নামে হাউজি, জুয়া খেলা ও অশ্লীল নাচের আসর বসেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মেলা বলা হলেও সেখানে কয়েকটি খাবারের হোটেল ছাড়া নেই কোনও চুড়ি-ফিতা, তৈজসপত্র, মণ্ডা-মিঠাই, খেলনা বা অন্যান্য পণ্যের কোনও দোকান। স্বাভাবিকভাবে মেলা দিনের বেলায় হওয়ার কথা থাকলেও এটি শুরু হয় রাত ১১টা থেকে। চলে ভোর ৫টা পর্যন্ত। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা তোফাজ্জল হোসেন রাজার আয়োজনেই এ মেলা চলছে।
জানা গেছে, চার বছর ধরে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘কুড়িটাকিয়ার মেলা’ বলেই পরিচিতি। উচ্চ আদালতে রিটের দোহাই দিয়ে মেলাটি পরিচালনা করছেন রাজা। তিনি নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা বলে দাবি করেন। যদিও তার দলীয় পদ সেভাবে কারও জানা নেই। তবে গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন।
৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলাটি শুরু হয়েছে। তবে শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানা যায়নি। কেউ কেউ বলছেন জুন পর্যন্ত মেলা চলবে। রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত এই মেলা চলে।
সরেজমিন দেখা গেছে, মেলায় ঢোকার মুখেই বিশাল তাঁবু টানিয়ে অস্থায়ী অডিটরিয়াম করা হয়েছে। রাত ১১ থেকে এখানে বসে হাউজির আসর। ঝলমলে আলোকসজ্জিত মঞ্চে রাখা হয় কয়েকটি মোটরসাইকেল। হাউজি খেলার সঞ্চালক মাইকে ঘোষণা করেন, ‘নিশি হলো ভোর, টু অ্যান্ড ফোর টুয়েন্টি ফোর, আল্লাহ সর্বশক্তিমান নম্বর কাটেন ওয়ান, পুলিশ পাওয়ার ফাইভ অ্যান্ড ফোর ফিফটি ফোর, সিয়ানা দ্য গ্রেড টু অ্যান্ড এইট-টুয়েন্টি এইট, পদ্মা মেঘনা ধলেশ্বরী নম্বর কাটেন থ্রি’। উপস্থিত লোকজন তখন বলে ওঠেন ইয়েস ইয়েস।
হাউজির আসর থেকে ২০ গজ দূরেই আরেকটি তাঁবুতে চলে ‘বউ চুরি’ জুয়ার আসর। তাঁবুর ভেতরে ৫টি বুথ। একেকটি বুথে একটি করে বড় টেবিল। টেবিল ঘিরে বসে আছে ৬ জন। প্রতিটি বুথের পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় শ’খানেক মানুষ। সবার হাতে টাকা। খেলার মহাজন ছক্কা ঘুরিয়ে দিয়ে একটি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেয়। টেবিলের ওপরে কয়েকটি ছবি। খেলোয়াড়রা সেই ছবিতে টাকা ছুড়ছেন। কেউ ৫০০, কেউবা হাজার টাকার নোট। যে ব্যক্তি যত টাকা ফেলছে তার মিলছে ডাবল। বাকি টাকা মহাজনের ঘরে। খেলার মহাজনরা কেউ স্থানীয় নয়। তারা এসেছেন ঘোড়াঘাট, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, রংপুর, নওগাঁ, বগুড়াসহ বেশ কিছু এলাকা থেকে। মেলা আয়োজকের সঙ্গে তারা দৈনিক ২ লাখ টাকার চুক্তি নিয়েছেন।
মেলায় আরও রয়েছে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থেকে আসা জোনাকি অপেরার নাচের আসর। ১১ জন নারী নৃত্যশিল্পী রাত ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত নাচেন।
মেলা ঘুরে দেখা গেছে, পুরো এলাকায় চারটি খাবার হোটেল, ৮টি পান সিগারেটের দোকান, তিনটি চায়ের দোকান ছাড়া আর কোনও পণ্যের দোকান নেই।
মেলায় রংপুরের কাউনিয়া থেকে মাইক্রোবাসে এসেছেন কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজন ভোলানাথ। তিনি জানান, তারা ৭ জন এসেছেন হাউজি খেলতে। এর আগেও দুইদিন এসেছেন তারা।
পাল্টাপুর এলাকার বাসিন্দা রাকিবুল ওয়ারিদ বলেন, ‘আমরা এই অবস্থা থেকে নিস্তার চাই। মেলার আয়োজক প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন না। এলাকার পরিবেশ নষ্ট করে চলেছেন তিনি।’
মেলায় আসা জোনাকি অপেরার মালিক রিপন বলেন, ‘প্রতিরাত মেলার মালিককে দিতে হয় ৮ হাজার টাকা। স্থানীয় নেতাদেরও কিছু সম্মানী দিতে হয়। এরপর যা থাকে সেটাই তার লাভ।’
মেলার আয়োজক রাজা বলেন, মেলা করতে তার কাছে হাইকোর্টের অনুমতি রয়েছে। মেলায় অসামাজিক কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মেলায় অসামাজিক কার্যকলাপের ব্যাপারে বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘কুড়িটাকিয়া নামে একটি সামাজিক মেলা করার অনুমোদনের চিঠি পেয়েছি। কিন্তু সেই মেলায় জুয়া, অশ্লীল নৃত্য কিংবা অসামাজিক কার্যকলাপের অনুমোদন নেই।’ মেলায় অসামাজিক কার্যকলাপ হলে তা বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।








