উৎপাদন মৌসুমের শুরুতেই বোরো ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ধানের জেলা দিনাজপুরের কৃষকরা। বাজারে ধান বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না তারা। এই অবস্থায় বোরো ধান আবাদ করে এবার চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন ধানের জেলার কৃষকরা। বাজারে তারা পানির দামে ধান বিক্রি করে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
দিনাজপুরের অন্যতম বৃহৎ ধানের বাজার সদর উপজেলার গোপালগঞ্জ ধানের হাটে গিয়ে দেখা যায়, বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়।
কৃষকরা জানান, এই দামে ধান বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচও উঠবে না তাদের। বাজারে দাম না থাকায় বাধ্য হয়েই লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করছেন তারা।
গোপালগঞ্জ হাটে ধান বিক্রি করতে আসা সদর উপজেলার নশিপুর গ্রামের কৃষক হাফিজউদ্দীন জানান, প্রতি বিঘা (৪৮ শতাংশ) জমিতে ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে সব মিলিয়ে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা। আর একবিঘা জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ৩৪ মণ। এক বিঘা জমির ধান বাজারে বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন ১৭ হাজার টাকা। এতে এক বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করে উৎপাদন খরচেই তার লোকসান গুনতে হচ্ছে ২ হাজার টাকা।
তিনি আরও জানান, ধার-দেনা করে বোরো ধান আবাদ করার পর তিনি ধার-দেনা শোধ করবেন কীভাবে, আর খাবেনই বা কী? একই কথা জানান, বাজারে ধান বিক্রি করতে আসা অন্য কৃষকরাও।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুম শুরু হওয়ায় শ্রমিক সংকটের কারণে চড়া দাম দিয়ে কৃষি শ্রমিক নিয়োগ করতে হচ্ছে। প্রতি বিঘা জমির ধান কাটা ও মাড়াই করতে শ্রমিকদের দিতে হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা। এর ওপর বাজারে ধানের দাম না থাকায় ধান কাটতেও সাহস পাচ্ছেন না কৃষকরা।
দিনাজপুর সদর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের কৃষক সহিরউদ্দীন জানালেন, বর্গা নিয়ে চার বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন তিনি। চাষ, সার, কীটনাশক, বীজ ও সেচসহ চার বিঘা জমিতে তারা মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এখন প্রতি বিঘা জমির ধান কাটা ও মাড়াই করতে কৃষি শ্রমিকরা চাচ্ছে ২০ হাজার টাকা। এই অবস্থায় বাজারে ধানের দাম না থাকায় বোরো কাটতে সাহস পাচ্ছেন না তিনি।
তিনি আরও জানান, সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করেছে তা পেলে লোকসান গুনতে হতো না তাদের। এজন্য কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার দাবি জানান তিনি।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক তৌহিদুল ইকবাল বলেন, ‘দিনাজপুরে জেলায় এবার মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই বোরো ধান কাটা শুরু করেছে কৃষকরা।’
বাজারে বোরো ধানের দাম না থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘দিনাজপুরে এখনও বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু করেনি খাদ্য বিভাগ।’ তবে বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু হলে বাজারে ধানের বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে সারাদেশে গত ২৫ এপ্রিল বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু হলেও এখনও দিনাজপুরে শুরু হয়নি বোরো সংগ্রহ অভিযান। আর এই সুযোগেই বাজারে ইচ্ছামত দামে ধান কিনছেন মিল মালিক।
দিনাজপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ আশ্রাফুজ্জামান বলেন, ‘দিনাজপুরে এবার ৮৫ হাজার ৪৭ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল, ৮ হাজার ৭৮৪ মেট্রিক টন আতপ চাল এবং ৫ হাজার ৪৮ মেট্রিক টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য ইতোমধ্যে ২ হাজার ৪৭৯ জন মিল মালিকের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। দিনাজপুরে মাত্র ৫ শতাংশ জমিতে বোরো ধান কাটায় এখনও বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হয়নি। তবে আগামী ৪/৫ দিনের মধ্যেই বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হবে।
নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে আলাপ আলোচনা করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি অর্থনীতিকে চাঙা করতে বর্তমান সরকার কৃষকদের বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে আসছে। সার নিয়ে ও কৃষি উপকরণ নিয়ে কৃষকদের আর উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয় না। এরপরও কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমুল্য পায়, সে ব্যাপারে সরকার সজাগ রয়েছে।’








