অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে সন্তানদের বাঁচাতে তিনটি নিঃসন্তান দম্পতির কাছে সন্তানদের দত্তক দেন গাইবান্ধার দুই পরিবার। এদের মধ্যে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রাজবাড়ি গ্রামের হাবিল মিয়া পাঁচ মাস বয়সী এক সন্তান এবং একই উপজেলার উত্তর ধর্মপুর গ্রামের ভাঙারি ব্যবসায়ী আশরাফুল তার জমজ চার কন্যা সন্তানের দুই জনকে দত্তক দিয়েছেন। ঘটনাগুলো গত তিন বছরের মধ্যে ঘটলেও সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হয়। পৃথক দুটি পরিবারে ঘটা এমন ঘটনা জেনে গত শুক্রবার এবং শনিবার তাদের খোঁজ নিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। দারিদ্র্য ঘোচাতে পরিবার দুটিকে সহায়তার আশ্বাসও দিয়েছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সুন্দরগঞ্জের রাজবাড়ি গ্রামের ভূমিহীন হাবিল মিয়া পেশায় শ্রমিক। অনটনের সংসার হলেও ছেলের মুখ দেখার আশায় একে একে পাঁচটি কন্যা সন্তান জন্ম দেন তিনি ও তার স্ত্রী। কিন্তু, বেশি সন্তানের বাবা-মা হওয়ায় তাদের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়েন তারা। এদিকে হাবিল মিয়ার শরীরে ধরা পড়ে যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন রোগ। শারীরিক অসুস্থতায় কাজকর্ম করতে না পারায় দু’বেলা দু’মুঠো খাবার যোগানো তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে, তার এক মেয়ে প্রতিবন্ধী, দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন কয়েক বছর আগে। এক মেয়ে কাজ করেন গৃহকর্মীর। আরও দুই মেয়ে ঘরে। তবে ৫ মাস বয়সী ছোট মেয়েকে পালন করা তার জন্য অসাধ্য হয়ে ওঠে। পরে এক আত্মীয়ের মধ্যস্থতায় ওই সন্তান যশোরের এক নিঃসন্তান দম্পতির হাতে তুলে দেন হাবিল।
হাবিল মিয়া বলেন, বাধ্য হয়ে নিজের ছোট মেয়েকে মানুষ করতে ভাতিজার মাধ্যমে নিঃসন্তান এক দম্পতির হাতে তুলে দিয়েছি। সে পরিবারের কর্তা একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি আমার সন্তানকে সুখে রেখেছেন। ভালোভাবে মানুষ করছেন। আর সন্তানকে দত্তক দেওয়ায় ওই পরিবার খুশি হয়ে আমাদের ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। ওই টাকা দিয়ে দুই শতক জমি কিনে একটি ছোট টিনের ঘর তুলেছি। বর্তমানে স্ত্রী ও বাকি তিন মেয়েকে নিয়ে কোনও রকম সেখানে দিনযাপন করছি।
হাবিল মিয়া বলেন, ‘আমার নিজের শরীরে নানা রোগ বাসা বেধেছে। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকলেও ঠিকমতো চিকিৎসা করতে পারি না। সাত মেয়েকে মানুষ করার সামর্থ্যও নাই আমার। নিজের বলতে কিছুই নাই।’
অন্যদিকে, দুই সন্তানকে দত্তক দেওয়া আশরাফুল পেশায় একজন ভাঙারি ব্যবসায়ী। জমজ চার মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। ভ্যান চালিয়ে গ্রাম ঘুরে ভাঙারি ব্যবসা করে যা পান তা দিয়ে কোনোরকমে চলেন। জমজ চার মেয়েকে মানুষ করা তার পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ালে বাধ্য হয়ে তিন বছর আগে এক মেয়ে ও দুই বছর আগে আরেক মেয়েকে স্থানীয় ব্যক্তির মাধ্যমে তুলে দেন দুই নিঃসন্তান দম্পতির হাতে।
এ বিষয়ে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ভাঙারি ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করি। সংসারে আমার দু’বার করে যমজ সন্তান হয়েছে। অভাবের কারণে তাদের আমি লালন-পালন করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে দুই মেয়েকে দুটি পরিবারকে দিয়ে দিয়েছি। মেয়েদের পেয়ে নিঃসন্তান দম্পতিরাও খুশি, তারা সাহায্য হিসেবে কিছু টাকাও দিয়েছেন। ওই টাকা পেয়ে অনেক উপকার হয়েছে আমার।’
তবে ভ্যানটা নষ্ট হওয়ায় ভাঙারি ব্যবসা ঠিকমতো করতে না পারায় বর্তমানে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে বলেও জানান আশরাফুল।
এদিকে, সম্প্রতি অভাবের কারণে সন্তান দত্তক দেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হওয়ায়, পরিবার দুটি তাদের সন্তানদের বিক্রি করে দিয়েছে কিনা সেই তথ্য নিশ্চিত হতে চায় প্রশাসন। কারণ, সন্তানদের দত্তক দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিষয়টির খোঁজ নিতে শনিবার (৮ জুন) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। এর আগে শুক্রবার দুপুরে পরিবার দুটির খোঁজ নেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ছোলাইমান আলী।
এসময় হাবিল মিয়া ও তার স্ত্রী এবং আশরাফুল ও তার স্ত্রী সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী এবং ইউএনও মো. ছোলাইমান আলীকে নিশ্চিত করেছেন তারা সন্তানদের বিক্রি করেননি। সন্তানরা যাতে ভালোভাবে প্রতিপালিত ও মানুষ হতে পারে সেজন্যই তাদের দত্তক দিয়েছেন। আর দত্তক গ্রহিতা নিঃসন্তান দম্পতিরা খুশি হয়ে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়ে দেওয়াসহ সামান্য কিছু টাকা পয়সা দিয়েছেন। এর পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।
উভয়ই জানান, তারা সন্তানদের নিয়মিত খোঁজ নেন এবং শিশুরা ওই তিন পরিবারের সঙ্গে ভালো আছে। তবে গণমাধ্যমের কাছে শিশুদের দত্তক নেওয়া পরিবারগুলোর পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি হাবিল মিয়া ও আশরাফুল।
এদিকে, হাবিল এবং আশরাফুলের পরিবারের এই কাহিনী জানেন প্রতিবেশীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
সর্বানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুর রহমান জানান, অভাবের কারণে যশোর এবং ঢাকার তিনটি নিঃসন্তান পরিবারের কাছে সন্তান তুলে দিয়েছে পরিবার দুটি। সেখানে তারা ভালো আছে। সন্তানদের ছাড়াও নিঃসন্তান দম্পতি পরিবারের সঙ্গে হাবিল ও আশরাফুলের যোগাযোগ আছে।
বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবার দুটির দারিদ্র্য ঘোচাতে তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘অত্যন্ত গরিব পরিবার হাবিল ও আশরাফুলের। অভাবের কারণে নিজের সন্তানদের দিয়েছেন অন্যের হাতে। সম্প্রতি তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছি। পরিবার দুটিকে ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। এছাড়া পরিবার দুটিকে সরকারি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করবো।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছোলাইমান আলী বলেন, অসহায় পরিবার দুটির পাশে থাকবে প্রশাসন। তাদের পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন সহায়তায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাবিলের প্রতিবন্ধী মেয়েকে প্রতিবন্ধী কার্ড দেওয়া হবে ও আশরাফুলের ভ্যান মেরামত করে দেওয়া হবে।







