প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার আট বছরেও চালু হয়নি নীলফামারী ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেন। তবে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।
গণপূর্ত বিভাগের সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার দুই বছর পর ২০১৩ সালে আটতলা হাসপাতাল ভবনটির কাজ শুরু হয়। ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সে সময়ের সদর আসনের সংসদ সদস্য আসাদূজ্জামান নূর। প্রথম ধাপে ভবনটির ছয়তলা পর্যন্ত কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ২০১৯ সালের এপ্রিলে ভবনটির ছয়তলা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ভবন নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সদ্য নির্মিত ২৫০ শয্যার হাসপাতালটি চালাতে হলে ২২০ জনের একটি টিমের প্রয়োজন। তবে আমাদের সেই প্রয়োজনীয় জনবল নেই। সঙ্কট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েও সমাধান মেলেনি।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ফাইলপত্র চালাচালি চলছে। তবে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগে। সব ধাপ পেরিয়ে ফাইলটি এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকা রয়েছে। এই জটলা কবে খুলবে বলা মুশকিল। তাই হাসপাতালটি উদ্বোধন করা যাচ্ছে না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ৫০ শয্যার চিকিৎসক দিয়ে চলছে। হাসপাতালে ২২ জন চিকিৎসকের বিপরীতে আছেন ১৩ জন। এরমধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) একজন, জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) একজন, জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) একজন, আর্থো-সার্জারি একজন, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক একজন, ডেন্টাল সার্জন একজন, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) একজন, এমও (মেডিক্যাল অফিসার) তিন জন, রেডিওলজিস্ট (আল্ট্রাসনোগ্রাম) একজন, ইএমও একজন, মেডিক্যাল অফিসার (ইউনানি) একজন নিয়ে ১৩ জন কর্মরত আছেন।
হাসপাতাল সূত্র আরও জানায়, ১৩ জন চিকিৎসক দিয়ে ৬টি ওয়ার্ডে (ইনডোর) গড়ে প্রতিদিন ৩৫০ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়। এছাড়াও আউটডোরে (বহির্বিভাগ) টোকেনধারী গড়ে প্রতিদিন ৮০০ রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। এতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হয়। আর সাধারণ রোগীরাও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা পান না।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স কল্পনা রাণী দাস বলেন, প্রতিদিন ৩৫০-৪০০ রোগী ভর্তি হন। এছাড়াও বহির্বিভাগে ৮০০-৯০০ রোগীকে সেবা দেওয়া হয়। তবে জনবল সঙ্কট ও জায়গার অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। এছাড়াও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পানীয় জলের বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়। ২৫০ শয্যার ভবনটি চালু হলে এ সমস্যা কেটে যাবে, তবে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতে হবে।
এদিকে, বছরের পর বছর জনবল সঙ্কটে তালা ঝুলছে কার্ডিওলজি (হৃদরোগ) বিভাগে। ফলে বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছে বিভাগের জন্য কেনা ৩৫ লাখ টাকার সরঞ্জামাদি। চালু হচ্ছে না ১০ শয্যার ইউনিটটি। এছাড়া হাসপাতালটিতে পুরনো একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন স্থাপন করা হলেও মাঝে-মধ্যেই সেটি নষ্ট হয়ে যায়। এতে রোগীদের হাসপাতালের বাইরে গিয়ে চড়া মূল্যে আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করে আসছে।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. আবু শফি মাহমুদ বলেন, কার্ডিওলজি বিভাগটি চালাতে দক্ষ জনবলসহ একেবারে আলাদা সবকিছু দরকার। বিভাগে মাত্র একজন চিকিৎসক রয়েছেন, যা দিয়ে ওই ইউনিট চালানো সম্ভব না। ১০ শয্যার ইউনিটটি চালাতে একজন বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল কর্মকর্তাসহ ১০ জন চিকিৎসক ও ২০ জন নার্স প্রয়োজন।
এছাড়াও আইসিইউ এবং সিসিইউয়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থার প্রয়োজন, তার কিছুই নেই হাসপাতালে। তিনি বলেন, প্রতিদিন ২-৩ জন রোগীকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়। তাদের চিকিৎসা দেওয়ার মতো কোনও ব্যবস্থা হাসপাতালে নেই।
হাসপাতালের রেডিওলোজিস্ট (আল্ট্রাসনোগ্রাম) মো. রেজাউল আলম বলেন, বর্তমানে আল্ট্রাসনোর মেশিনটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। মাঝে মধ্যে মেশিনটি সারিয়ে কিছুদিন চালানো হয়, আবার নস্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোর পরও কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
নীলফামারী সদর আধুনিক হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এনামুল হক বলেন, হাসপাতালের ২২টি পদের বিপরীতে ৯টি পদই শূন্য রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চিকিৎসক আছেন ১৩ জন, নার্স ৭২ জনের বিপরীতে ৫৪ জন, ফার্মাসিস্ট তিন জনের বিপরীতে একজন, ড্রাইভার দুই জনের বিপরীতে একজন, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ও ডেন্টাল বিভাগে একজনও নেই। নিরাপত্তা প্রহরী, আয়া, ওয়ার্ডবয়ের পোস্টগুলোও শূন্য রয়েছে।
সিভিল সার্জন ডা. রনজিৎ কুমার বর্মন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জেলার প্রতিটি হাসপাতালে প্রায় ৭০ শতাংশ পদ খালি আছে। প্রয়োজনের তুলনায় কমসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সঙ্কটের কথা বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কাজ হয়নি। ২৫০ শয্যার হাসপাতালটি চালুর বিষয়েও কথা বলছি। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন পেলে, দ্রুত হাসপাতালটি কার্যক্রম চালু করা যাবে।








