শেষযাত্রায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা চান না আরেক অভিমানী মুক্তিযোদ্ধা সলিম উদ্দিন। বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) নিজের ক্ষোভ-দুঃখের কথাগুলো জানিয়ে তিনি চিঠি দিয়েছেন পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবরে। স্বজনদেরও নির্দেশ দিয়েছেন—মৃত্যুর পর প্রশাসনের স্যালুট ও বিউগলের করুণ সুর ছাড়াই তাকে যেন দাফন করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা সলিম উদ্দিনের বাড়ি পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার কাটালী মীরপাড়া গ্রামে। গতকাল বৃহস্পতিবার ডিসি বরাবর চিঠি পাঠান তিনি। একইসঙ্গে এই চিঠি পাঠান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের দফতরসহ আরও কিছু সরকারি দফতরে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ছেলের চাকরি না হওয়ার ক্ষোভে রাষ্ট্রীয় সম্মান চান না জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন সলিম উদ্দিন।
এর আগে শেষযাত্রায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা চাননি দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামের অভিমানী মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন। মৃত্যুর দুই দিন আগে নিজের ক্ষোভ-দুঃখের কথাগুলো লিখে রেখে যান স্বজনদের কাছে। গত ২৩ অক্টোবর সকাল ১১টায় মারা গেলে পরদিন ২৪ অক্টোবর ইসমাইল হোসেনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন করা হয়। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা শেষ বিদায় নেন প্রশাসনের স্যালুট ও বিউগলের করুণ সুর ছাড়াই। অন্যায়ভাবে ছেলে নুর ইসলামকে চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত করার ক্ষোভ নিয়ে মারা যান মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন।
ডিসি বরাবর পাঠানো চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা সলিম উদ্দিন উল্লেখ করেছেন, সম্প্রতি আটোয়ারী উপজেলার ১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দফতরি কাম নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সলিম উদ্দিনের ছেলে সাহিবুল ইসলাম দাড়খোর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দফতরি কাম নৈশপ্রহরী পদে আবেদন করেন এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু ওই চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা না মেনে সাদেকুল ইসলাম নামে অন্য এক প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা সলিম উদ্দিন অভিযোগ করেছেন, টাকা নিয়ে সাদেকুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরে এই অনিয়ম নিয়ে নিয়োগ কমিটির সভাপতি আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে সহকারী জজ আদালতে (আটোয়ারী) একটি মামলা করেন মুক্তিযোদ্ধা সলিম উদ্দিনের ছেলে। এ মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। তবে এ মামলা তুলে নিতে মুক্তিযোদ্ধা সলিম উদ্দিন ও তার ছেলে সাহিবুল ইসলামকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। কোটা না মানায় একভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হয়েছে দাবি করে মুক্তিযোদ্ধা সলিম উদ্দিন আরও লিখেছেন, ওই অনিয়মের বিচার না হলে শেষযাত্রায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা চান না তিনি।
এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা সলিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি দরিদ্র মানুষ। ছেলের চাকরির জন্য ঘুষ দিতে পারিনি। তাই ওরা আমার ছেলেকে চাকরি দিলো না। আমার ছেলে যোগ্য প্রার্থী ছিল। সে আনসার ভিডিপি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারপরও তার চাকরি হলো না। যারা টাকা দিয়েছে, তাদের চাকরি হয়েছে। আমি এর প্রতিবাদে মামলা করেছি বলে বিভিন্নভাবে আমাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমন অনিয়ম যদি দেখতেই হবে, তবে আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম কেন? এসব ঘটনার বিচার না হলে মৃত্যুর পর আমি এমন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের দেওয়া রাষ্ট্রীয় সম্মান চাই না।’
সলিম উদ্দিনের ছেলে সাহিবুল ইসলাম দাবি করেন, ‘প্রচুর অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ কমিটি ওই চাকরি দিয়েছে সাদেকুল ইসলামকে। আমার যেহেতু টাকা ছিল না, তাই যোগ্যতা থাকার পরও আমার চাকরি হয়নি। আমি শুনেছি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারদলীয় নেতা, নিয়োগ কমিটিসহ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা লাখ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৫ মে আটোয়ারীর ১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দফতরি কাম নৈশপ্রহরী নিয়োগের জন্য প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরে ১ জুলাই মৌখিক পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের নামের তালিকা প্রকাশ করে নিয়োগ কমিটি। মুক্তিযোদ্ধা সলিম উদ্দিন ও তার ছেলে সাহিবুল ইসলামসহ কয়েকজন প্রার্থীর অভিযোগ, ‘নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা তো মানা হয়নি, উপরন্তু প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে ঘুষ নেওয়া হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রার্থী বলেন, ‘আমার কাছে নিয়োগ কমিটি দুই লাখ টাকা দাবি করে। কিন্তু আমি তা দিতে পারিনি; আমার চাকরি হয়নি।’
দফতরি কাম নৈশপ্রহরী নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে অভিযোগ এনে গত ৪ জুলাই পঞ্চগড় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী জজ আদালতে আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ নিয়োগ কমিটির পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন সলিম উদ্দিনের ছেলে সাহিবুল ইসলাম। বিচারক মো. শরিফুল ইসলাম খান ওই নিয়োগের ওপর কেন স্থগিতাদেশ দেওয়া হবে না জানতে চেয়ে আটোয়ারীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ পাঁচ জনকে শোকজ করেন এবং এর পরবর্তী পাঁচ দিনের মধ্যে শোকজের জবাব দিতে নির্দেশ দেন।
এ ব্যাপারে নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ‘মামলার বিষয়টি শুনেছি। আর্থিক লেনদেনসহ অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
এ ব্যাপারে আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেন, ‘নীতিমালার কোথাও বলা নেই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় দফতরি কাম নৈশপ্রহরী নিয়োগ দিতে হবে। একাধিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা বিবেচনায় আসে। একজনের ক্ষেত্রে আসে না। নিয়োগে টাকা লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তবে কেউ যদি আমার নাম ভাঙিয়ে টাকা নেয়, সেই দায় আমার না।’
মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান না নেওয়ার প্রসঙ্গে আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ মাহমুদ হাসান বলেন, ‘আমি এখনও এরকম কোনও অভিযোগ পাইনি। অভিযোগের কাগজ পেলে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’
এ ব্যাপারে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা তার ছেলের চাকরি হয়নি বলে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, অনিয়মের বিচার না হলে তিনি মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান চান না। আমি খোঁজ নিয়ে বিষয়টি দেখবো।’
আরও পড়ুন—








