হিলিতে চলতি আমন মৌসুমে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযানে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান না কিনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা ও মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ীর যোগসাজশে এ ধান সংগ্রহ অভিযান চলছে বলে কৃষকরা জানান। লটারিতে নাম ওঠা দু’একজন কৃষক ধান দিতে পারলেও তাদের নানা রকম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যারা খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন তাদের ৪০ কেজির পরিবর্তে দিতে হচ্ছে ৪৩ কেজি। কার্ড প্রতি দিতে হচ্ছে বাড়তি এক হাজার টাকা।
এছাড়াও অনেক খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার হয়রানির কারণে কৃষকরা গুদামে ধান না দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। আর সেই সুযোগে মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী কৃষকদের কার্ড কিনে গুদামে ধান দিচ্ছেন।
হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সরবরাহ করা কার্ডধারী ১২ হাজার ২৬ জন কৃষকের মধ্যে থেকে গত ১ ডিসেম্বর উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে ৮৯২ জনকে নির্বাচন করা হয়। যার তালিকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়, খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার কার্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন কৃষক ২৬ টাকা কেজি দরে ১ টন ধান সরকারি খাদ্য গুদামে দিতে পারবেন। চলতি মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে ৮শ’ ৯২টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি কৃষকদের কাছ থেকে ধান না নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান নেওয়ার এই কার্যক্রম স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা বন্ধ করে দিলেও তা বন্ধ হয়নি। পরে তা আবার শুরু হয়েছে।
হিলির ছাতনি গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হক ও টুডু সরেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহের জন্য লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে বলে শুনেছি। আমরা ৮/১০ বিঘা জমি আবাদ করেছি। কিন্তু ওই তালিকায় আমাদের কারও নাম নেই। আমাদের আশপাশের অনেকেই আছে যারা একমুঠো ধানও আবাদ করেনি। ওই তালিকায় এমন অনেকের নাম আছে যারা ধান করেনি এবং যাদের এক মুঠো ধান দেওয়ার সামর্থ নেই। তাদের নাম ঠিকই উঠেছে। আবার লটারিতে নাম উঠা অনেক কৃষক হয়রানি এড়াতে তাদের কার্ডগুলো ২/৩ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। এছাড়াও অনেক কৃষক লটারিতে নাম উঠার পরও খাদ্য গুদামের নানা রকম হয়রানির কারণে সেখানে ধান দিতে পারছে না। এমন কয়েক জনকে আমরা দেখেছি যারা বাধ্য হয়ে সিন্ডিকেটের কাছে তাদের কার্ড বিক্রি করে দিয়েছেন। অন্যদিকে কৃষকদের কার্ড দিয়ে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন স্থান থেকে ধান কিনে গুদামে দিচ্ছেন।
খাদ্যগুদামে ধান দিতে আসা হিলির আলিহাটের কৃষক আবু রায়হান ও ধাওয়ার আবুল কাশেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে ধান নিয়ে হিলি এলএসডিতে আসি, সেসময় আমার ধানের পার্সেন্ট যেটা থাকার কথা সেটাও ছিল। কিন্তু ধান উঠাবো, উঠাচ্ছি এই করতে করতে সন্ধ্যা লেগে গেলো, সন্ধ্যার পর গুদাম কর্মকর্তা এসে বললো সন্ধ্যার পর কোনও ধান উঠানো যাবে না টিএনও সাহেবের নির্দেশ। যাদের ধান এখানে রয়েছে সকলের ধান উঠানো হবে আপনারা আগামীকাল সকালে আসেন। সেই মোতাবেক শুক্রবার সকালে আবার ধান নিয়ে আসি, সেদিনও ধান উঠাতে উঠাতে দুপুরের আজান হয়ে গেলো। আমরা যারা প্রকৃত কার্ডধারী কৃষক তাদের খাদ্যগুদামে ধান দিতে এসে পেরেশানি ও হয়রানি হতে হচ্ছে। কিন্তু যারা ব্যবসায়ী এবং কৃষকের কাছ থেকে কার্ড কিনে নিচ্ছেন তাদের ধান কোনও রকম পরিক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি গুদামে উঠিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় ৪০ কেজিতে এক মন হলেও আমাদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৪৩ থেকে ৪৪ কেজি করে ধান। তাই আমরা বাড়ি থেকে যে মাপ দিয়ে ধান নিয়ে আসছি গুদামে দেওয়ার সময় দেখি হিসেব মিলছে না। আবার বাড়ি থেকে ধান এনে সেই ধান পুড়িয়ে দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমরা বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছি। এছাড়াও কার্ড প্রতি কৃষকদের কাছ থেকে ১ হাজার করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে ধান পাশ হবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রাফিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যারা কৃষি কার্ড করেছেন কৃষি অফিসে যাদের তালিকা রয়েছে সেই তালিকা অনুযায়ীই লটারি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ৮৯২ জন কৃষক নির্বাচিত করা হয়েছেন। তবে কৃষি অফিস বেশ কিছুদিন আগে এই তালিকা তৈরি করেছিল। সম্প্রতি আমরা জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ওই তালিকা সংশোধনও করেছি। এর মধ্যে কেউ মারা গেছেন কিনা বা নিঃস্ব হয়ে গেছেন কিনা তা ঠিক করে প্রকৃত কৃষকদের তালিকা করেছি। এরপরও যদি এমন কেউ থাকে যারা আবাদ করছেন না অথচ সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করছেন তা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুনিদৃষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
হিলি খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা যোসেফ হাসদা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলতি আমন সংগ্রহ মৌসুমে হাকিমপুর উপজেলায় ৮৯২ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্ভবত ২০ ডিসেম্বর থেকে আমরা আমন ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছি। এ পর্যন্ত আমাদের মোট সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৪৮ টন। ’
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন,‘কেউ কৃষকের কার্ড কিনে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করে থাকলে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমরা প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকেই ধান নিচ্ছি।’ তবে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪৩ কেজি ধান নেওয়া ও ১ হাজার করে টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট কোনও জবাব দিতে পারেননি।







