পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের সোনারবান বাঁশবাড়ি এলাকায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগ এনে গ্রাম্য সালিশে খায়রুল ইসলাম (১৭) নামে এক দিনমজুর কিশোরকে মারধর করা হয়েছে। সালিশ শেষে বাড়ি ফিরে অপমানে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে ওই কিশোর। এ ঘটনায় পঞ্চগড় সদর থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু আককাছ আহমেদ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাতে স্থানীয় একটি মসজিদের সামনে ওই সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন রাতেই সে আত্মহত্যা করে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সাজানো ঘটনায় সালিশের মাধ্যমে ওই কিশোরকে মারধর করা হয়েছে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে খায়রুলকে বাড়ি থেকে ধরে এনে সোনারবান বাঁশবাড়ি মসজিদের সামনে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে সালিশ বসায় এলাকার প্রভাবশালীরা। সালিশে ওই শিশুর মা অভিযোগ করেন, গত ২০ এপ্রিল দুপুরে তার ৬ বছরের মেয়েকে স্থানীয় গড়ের (মাটির উঁচু প্রাচীর) নিচে নিয়ে ধর্ষণ করেছে খায়রুল।
ধর্ষণের বিষয়টি অস্বীকার করে খায়রুল সালিশে জানায়, গড়ের নিচে সে ও তার মামাতো ভাই আজিত বসে ছিল। শিশুটিও সেখানে বসে ছিল। ওই কিশোরের ব্যাখ্যা চলাকালে তার বাবা আব্দুর রশিদ সালিশে উপস্থিত হন। এ সময় সবাই তাকে গালিগালাজ করতে থাকেন। অপমান সইতে না পেরে আব্দুর রাশিদ ছেলেকে জুতাপেটা করেন। পরে তিনি সালিশে উপস্থিত বিচারকদের বিষয়টি তদন্ত করে দেখার অনুরোধ জানান। কিন্তু তারা কোনও কথা না শুনে শরিয়তি বিচারে তাকে কয়েকটি বাঁশের কঞ্চি একত্র করে মারধর শুরু করেন।
এলাকাবাসী জানান, সালিশ পরিচালনা করেন অমরখানা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কদম আলী; ৩, ৫ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্যের স্বামী আক্কাস আলী; বাঁশবাড়ি মসজিদ কমিটির সভাপতি কিতাব আলী; সাধারণ সম্পাদক জাকের খাঁ, আবু খয়ের এবং দেলোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।
জানা যায়, ঘটনার সময় খায়রুলের সঙ্গে তার মামাতো ভাই আজিত থাকলেও সালিশে তার কোনও বিচার করা হয়নি। বিচার শেষে বাড়ি ফেরার সময় আজিতের বিচার না হওয়া নিয়ে তার চাচাতো ভাই দেলোয়ারের সঙ্গে তর্ক হয় খায়রুলের। একপর্যায়ে দেলোয়ার তাকে পেছন থেকে লাথি মেরে বাড়ি গিয়ে আত্মহত্যা করতে বলেন। এর কিছুক্ষণ পর বাড়ি গিয়ে নিজ ঘরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে খায়রুল।
খায়রুলের বাবা আব্দুর রশিদ বলেন, 'আমি বাড়ি ফিরে দেখি ছেলেকে ওরা ধরে নিয়ে গিয়ে সালিশে বসিয়েছেন। সালিশে উপস্থিত নেতাদের কটুক্তি সইতে না পেরে ছেলেকে মারধর করি। পরে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার অনুরোধ করি, কিন্তু তারা আমার কোনও কথা শোনেননি। ছেলেকে অনেক মারধর করেছে। কোনও কিছু না করেও এমন অপমান সইতে না পেরে ছেলে আত্মহত্যা করেছে। আমি এর বিচার চাই।'
খায়রুলের প্রতিবেশী আব্দুল জলিল বলেন, 'শুনেছি ঘটনার দিন খায়রুল তার মামাতো ভাই আজিতের সঙ্গে বাড়ির পাশের গড়ের নিচে বসে ছিল। ওই শিশুটিও তাদের সঙ্গে বসে ছিল। কিছুক্ষণ পরে স্থানীয় এক মেয়ে শিশুটিকে ডেকে বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু ঘটনার কয়েকদিন পর হঠাৎ খায়রুলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলা হয়। সালিশ বসিয়ে তাকে মারধর করা হয়। সে যদি ধর্ষণ করেই থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যেতো। প্রমাণিত হলে আদালত তাকে শাস্তি দিতো। কিন্তু মোড়লরা তা না করে নিজেরাই শাস্তি দিয়েছেন। অথচ ঘটনায় সময় সেখানে আজিত থাকলেও তার কোনও বিচার করেননি তারা।'
সালিশকারী আওয়ামী লীগ নেতা কদম আলী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'ধর্ষণের অভিযোগে সালিশে আমি উপস্থিত ছিলাম। আমরা তার বাবাকে বলেছি, ছেলের বিচার যেন তিনি নিজেই করেন। পরে তার বাবা তাকে মেরেছেন। পরে আমি সেখান থেকে চলে যাই। এরপর কী হয়েছে, তা জানি না। আজিতের বিষয়ে কেউ কোনও অভিযোগ তোলেননি, তাই তার বিচারও হয়নি।'
অমরখানা ইউনিয়নের ৩, ৫, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য শাহনাজ পারভীন বিউটি বলেন, 'শালিসে আমার স্বামীকে পাঠিয়েছিলাম। ওই যুবককে অন্য কেউ মারধর করেননি। শুধু তার বাবাই মেরেছেন। তবে দেলোয়ার তাকে আত্মহত্যা করতে বলেছিল।'
ওসি জানান, ওই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। মামলা হলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








