কুড়িগ্রামে করোনা পরিস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জেলা জজ আদালতের এক কর্মচারীকে সাজা দেওয়ার ঘটনাকে নিয়মবহির্ভূত ও বে-আইনি দাবি করেছেন আইনজীবী ও জজ আদালতের কর্মচারীরা। এ রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ বিচার বিভাগীয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশন।
জানা গেছে, গত ৪ মে জেলা শহরের আদর্শ পৌর বাজার এলাকায় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী মেজিস্ট্রেট অভিজিৎ চৌধুরী একসঙ্গে দুই জন রিকশায় ওঠার অপরাধে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইন-২০১৮ এর ২৫ (১) ধারায় জেলা জজ আদালতের এক কর্মচারীকে অর্থদণ্ড দেন।
বাংলাদেশ বিচার বিভাগীয় কর্মচারী অ্যাসাসিয়েশনের সভাপতি শাহ মো. মামুন এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী সালাউদ্দিন দিদার স্বাক্ষরিত প্রতিবাদ লিপি সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জজ আদালতের ক্যাশিয়ার মো. আনসার আলী এবং অফিস সহায়ক মো. মোশারফ আলী গত ৪ মে সোনালী ব্যাংকের কুড়িগ্রাম শাখা হতে ৫ লাখ ৮০ হাজার একশ' টাকা উত্তোলন করে রিকশায় আদালতের দিকে যাচ্ছিলেন। এটি ছিলো জেলা জজ আদালতের কর্মচারীদের আসন্ন ঈদুল ফিতরের উৎসব ভাতার টাকা। এ সময় জেলা শহরের আদর্শ পৌর বাজার এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী মেজিস্ট্রেট রিকশা থামিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করেন, কেন তারা দুই জন একসঙ্গে রিকশায় উঠেছেন। উত্তরে তারা জানান, জজ আদালতের কর্মচারীদের উৎসব ভাতার টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে আদালত ভবনে নিয়ে যেতে নিরাপত্তার স্বার্থে দুই জন একসঙ্গে রিকশা উঠেছেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক নির্বাহী মেজিস্ট্রেট অভিজিৎ চৌধুরী তাদের জবাব আমলে না নিয়ে দুইশ' টাকা অর্থদণ্ড দেন। অফিস সহায়করা দোষ স্বীকার না করে দণ্ডাদেশ চ্যালেঞ্জ করলে নির্বাহী মেজিস্ট্রেট চাপ সৃষ্টি করে টাকা আদায় করেন।
প্রতিবাদ লিপিতে উক্ত ঘটনাকে আইনের অপপ্রয়োগ দাবি করে এ ঘটনায় আদালতের কর্মচারীদের সরকারি কাজে বাধা এবং আইনকে অসম্মান করে বিচার বিভাগের মান ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। একইসঙ্গে এ ঘটনাকে আইনের অপপ্রয়োগ এবং বেআইনিভাবে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার দাবি করে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানো হয়।
এ বিষয়ে সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন-২০১৮ অনুযায়ী কোনও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওই আইনে কোনও বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারেন না। আবার ওই আইনের কথা উল্লেখ করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গত ১০ এপ্রিল যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন, সেই অনুযায়ী রিকশায় একাধিক যাত্রী ওঠার অপরাধে যাত্রীকে সাজা দেওয়া বৈধ নয়। কারণ গণবিজ্ঞপ্তিতে ( ২ নম্বর ক্রমিকে) স্পষ্ট বলা হয়েছে, এমন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিবহন জব্দ করে থানায় নিতে হবে। অথচ উল্লিখিত ঘটনায় রিকশার যাত্রীকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং সেই যাত্রীরা সরকারি কাজে বের হয়েছিলেন। অর্থাৎ ওই নির্বাহী মেজিস্ট্রেট গণবিজ্ঞপ্তিটি ভালো করে না পড়ে, সাজা দিয়ে আইনের লঙ্ঘন করেছেন।’
কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত যে আইন অনুযায়ী ওই সাজা দিয়েছেন তা বৈধ হয়নি।’
এ ব্যাপারে জানতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিজিৎ চৌধুরীকে ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস) ও একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জেলা প্রশাসক ও জেলা মেজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘বিষয়টি আমার নলেজে এসেছে। প্রিজাইডিং অফিসার সংশ্লিষ্ট আইন দেখে ব্যবস্থা নিয়েছেন। সেখানে যদি তার ত্রুটি বিচ্যুতি থাকে, সেটা সংক্ষুদ্ধ পক্ষ আমার কাছে বলতে পারে। যেহেতু আমার মেজিস্ট্রেট এটা করেছে, সেখানে প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে তার যদি ত্রুটি বিচ্যুতি থাকে, আপিল করলে আমি সেটা দেখবো।’








