নীলফামারীর ছয় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে হাজারেরও বেশি গবাদিপশু ক্যাপরিপক্স ভাইরাসের মধ্যমে ‘লাম্ফি স্কিন' রোগে আক্রান্ত হয়েছে। রোগটির সুনির্দিষ্ট কোনও প্রতিষেধক নেই। এরই মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে জেলায় দু'টি গরু মারা গেছে। কোরবানির ঈদের আগে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারিরা।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস জানায়, ‘লাম্ফি স্কিন’ রোগের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। এর সুনির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। লক্ষণ দেখে আক্রান্ত পশুকে পেনিসিলিন, এন্টি হিস্টামিন এবং জ্বর হলে প্যারাসিটামল দিলে কিছুটা উপকার পাওয়া যায়। এন্টিসেপটিক হিসেবে খাবার সোডা পরিমাণ মতো পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত পশুর শরীর পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে খামারিদের।
জেলা সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া সরকার পাড়া গ্রামের কৃষক সেকেন্দার আলী বলেন, 'আমার তিনটি গরু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া এই গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে ভাইরাসটি হানা দিয়েছে। সংক্রমিত হয়েছে শতাধিক গরু। আমার আক্রান্ত ৩টি গরুর পেছনে ১০ হাজার টাকা খরচ করেও সুস্থ হয়নি।'
একই পাড়ার আশরাফ আলী বলেন, ‘খামারিসহ ব্যক্তি পর্যায়ে কোরবানিকে সমানে রেখে পালন করা গবাদিপশুর মধ্যে ভাইরাসটির সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। আবার অনেকেই বাধ্য হয়ে আক্রান্ত পশু বিক্রিও করছেন।' তিনি বলেন, 'এই পাড়ায় কিছুদিন আগে মঞ্জুরুল নামে এক কৃষকের ৭০ হাজার টাকা দামের শাহি ওয়াল জাতের একটি গরু এবং সুবল চন্দ্র রায়ের একটি বকনা বাছুর মারা যায়। তারা গরু মরার শোকে কাতর।'
তিনি অভিযোগ করেন, 'জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের লোকজনকে খবর দিয়েও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে গ্রামের হাতুড়ে চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।'
আরেক কৃষক মঞ্জুরুল আলম বলেন, '১৫ দিন আগে চামড়া ফোলা রোগে আক্রান্ত হয়ে আমার একটি শাহী ওয়াল জাতের গরু মারা গিয়েছে। গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়ে কোনও ফল হয়নি। টাকাও খরচ হয়েছে ৫-৭ হাজার। তবুও গরুটিকে বাঁচাতে পারিনি। যার বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৭০ হাজার টাকা। গরু মারা যাওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।' সুবল চন্দ্র রায়ও একই কথা বলেন। তারা দু’জনই সরকারের কাছে প্রণোদনার দাবি জানান।
উপজেলার ইটাখোলা ইউনিয়নের সিংদই গ্রামের গৃহিনী আনোয়ারা বেগম ও লতিফুর রহমান বলেন, 'কোনও বাড়ি বাদ নেই। সবার গরুর অসুখ হয়েছে।' উপসর্গের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'প্রথমে গরুর জ্বর হয়, এর পর গা গুটি গুটি হয়ে ফুলে যায়। ঘা হয়ে পেকে ফেটে গিয়ে পুঁজ বের হয়। কাঁপুনিও থাকে।'
তারা অভিযোগ করেন, 'সরকারি ডাক্তারকে ফোন দিলে বলেন, কোন দিকে যাবো ভাই, সবদিকে একই অবস্থা। বারবার ফোন দিয়েও দেখা মেলে না।’
উপজেলার পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের দিঘলটারী গ্রামের কৃষক আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রতিটি বাড়িতে এই রোগ দেখা দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের পর গ্রাম। গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছে মানুষ। তিনি জানান, করোনা পরিস্থিতিতে টাকা পয়সা হাতে না থাকায় আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পশুর মালিককে। দেখা মেলেনি সরকারি চিকিৎসকের।
জেলার সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রাশেদুল হক জানান, এবার নতুন করে ‘লাম্ফি স্কিন’ রোগটি দেখা দিয়েছে। মাঠ পর্যায়ে মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি গোট-টিস্যু ভ্যাকসিন পশুর ওজন ভেদে ২-৩ মি. লি. করে দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত পশুর লক্ষণ দেখে চিকিৎসা দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের ছইল পলি পাড়া গ্রামের মকবুল হোসেন শাহ বলেন, ‘এই রোগের সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায়, আমার একটি গরু মারা গেছে। যার বাজার মূল্য ৫৫ হাজার টাকা।’
তবে খামারিদের অভিযোগ অস্বীকার করেন সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'ভ্যাপসা গরম আর টানা বৃষ্টির ফলে ‘লাম্ফি স্কিন’ রোগটি স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। জনবল সংকটের কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনটি ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। এতে তিন জন ডাক্তারের নেতৃত্বে উপজেলার পৌরসভাসহ ১৫টি ইউনিয়নে গোট-টিস্যু ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, ‘নীলফামারী সদরে এক লাখ ৫০ হাজার গরু রয়েছে। এর মধ্যে ১৪৫টি গরুর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোনাক্কা আলী জানান, প্রায় এক মাস ধরে এই ক্যাপরিপক্স ভাইরাসটি গ্রাম অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এই অসুখটিকে ‘লাম্ফি স্কিন’ ডিজিস বলে জানিয়েছেন বিষেষজ্ঞরা। এই রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়া ফুলে গোটা গোটা হচ্ছে। পরে তা ঘায়ে পরিণত হয়ে ফেটে রস বের হয়। এমনকি পশুর জ্বর হচ্ছে। তিনি জানান, রোগ প্রতিরোধে মশা, মাছি থেকে পশুকে দূরে রাখতে মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।







