চিলমারীর রমনা ইউনিয়নের মাস্টার পাড়া গ্রামে বাড়ি আনিছা বেগমের। অভাবের তাড়নায় স্বামী আমিনুল ইসলাম সম্প্রতি রংপুরে গিয়ে রিকশা চালাচ্ছেন। এরই মধ্যে বাড়িতে বানের পানি উঠেছে। তাই দুই সন্তান নিয়ে আনিছা আশ্রয় নিয়েছেন ওয়াপদা বাঁধে। পলিথিনের ছাউনি দিয়ে ঝুপড়ি তুলে সেখানেই বাস করছেন এক সপ্তাহ ধরে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) ছোট সন্তানকে পাশে নিয়ে আনিছা রান্না করছিলেন। আর বাঁধের ওপর ১০ বছরের মেয়ে আদিলা অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিল। হঠাৎ করে সে পানিতে পড়ে যায়। তিন ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবরি দল আদিলার মরদেহ উদ্ধার করে। আদিলার মতো এমন ঝুঁকিতে রয়েছে কুড়িগ্রামের বানভাসি এলাকার শিশুরা।
কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর ২৪ জুলাই পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে জেলায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ১৬টি শিশু।
বাংলাদেশে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে নিরীক্ষণ সংশ্লিষ্ট এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বন্যার কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে বানভাসি শিশুরা। বন্যার জন্য অনেক শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস্তুচ্যুত ও আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হওয়ার পাশাপাশি পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। এছাড়া বন্যাকালীন শিশুরা শারীরিক, যৌন ও মানসিক নিপীড়ন এবং বাল্য বিয়ের শিকার হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বন্যায় জেলায় ২১ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ১৬টি শিশু। ২০১৮ সালে পানিতে ডুবে কোনও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া না গেলেও ২০১৭ সালের বন্যায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা ২০। জেলায় গত ৫ বছরে শুধু বন্যার পানিতে ডুবে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ৫৯টি শিশু। অর্থাৎ শিশু মৃত্যু হার ৭৩.৭৫ ভাগ।
গত কয়েক বছর ধরে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও শিশুদের সুরক্ষায় সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোনও কর্মসূচি দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিভাবকদের উদাসীনতা ও অসচেতনতার পাশাপাশি বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্রে না যাওয়া শিশুদের জীবনহানির অন্যতম কারণ।
সরেজমিন দেখা গেছে, বন্যার পানিতে ও পানির পাশে খেলছে বানভাসি শিশুরা। এ নিয়ে অভিভাবকরা তেমন উদ্বিগ্ন নন। বাঁধে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর এ যেন এক চিরাচরিত উদাসীনতা।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ন্যাশনাল চিলড্রেন টাস্কফোর্স (এনসিটিএফ) এর সেন্ট্রাল ইয়ুথ ভলান্টিয়ার রেজওয়ানুল হক নূরনবী বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন যে সচেতনতাও হার মেনেছে। বানভাসিরা যে অবস্থায় বসবাস করছেন সেখানে সচেতনতা শব্দটি জীবন বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বন্যা কবলিত এলাকায় যেসব পরিবারে শিশু রয়েছে তাদেরকে বাড়ি থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করা এবং বানের পানি থেকে দূরে কোনও আশ্রয়কেন্দ্রে এসব পরিবারকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা গেলে এসব শিশু মৃত্যু এড়ানো যেতো।’ বন্যাকবলিত এলাকার বেশিরভাগ শিশুর জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনে বন্যাকালীন সময়ে শিশুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া ছাড়া শিশু মৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে শিশু সুরক্ষায় বিশেষায়িত আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে বলে মত তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে প্রচার চালিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। বাড়িতে পানি ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আপদকালীন সময়ে শিশুদের সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপ করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘যে শিশুগুলো মারা গেছে তারা শুধু অভিভাবকদের সতর্কতার অভাবে প্রাণ হারিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আসলে হয়তো প্রাণহানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেত। কিন্তু অনেক বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চান না।’
বন্যাকালীন দুর্গত এলাকায় শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের প্রতি যত্নবান হতে মানুষদের মধ্যে প্রচার চালাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউএনও এবং জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
শিশুদের জন্য বিশেষায়িত আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এটা সরকারের পলিসি মেকিংয়ের বিষয়। আমরা তেমন নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’








