দফায় দফায় বর্ষণ এবং উজানের ঢলে বেড়েই চলেছে গাইবান্ধার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি। নতুন করে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১৫টি ইউনিয়নের ঘাঘট ও করতোয়া নদী তীরবর্তী এলাকা। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। এ নিয়ে জেলার সাত উপজেলার অন্তত ৪০টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নঞ্চলের প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
এর আগে, গত ২৫ জুন থেকে জেলার সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ৩০টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নদীর তীররর্তী এলাকার প্রায় দেড় লাখ লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েন। প্রথম ও দ্বিতীয় দফার বন্যায় পানিবন্দি অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উঁচু স্থানে। তবে আশ্রয় নেওয়া পানিবন্দি এসব মানুষ দুর্ভোগ-সংকটে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যাকবিলত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও এখনও ত্রাণ পাননি বলে অভিযোগ বানভাসিদের অনেকের।
দুই দফার বন্যার পানিতে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এবং আমন বীজতলা, আউশ ধান, পাট, বাদাম ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে বন্যাকবলিত এলাকার প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে পচে নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির শিকার হয়েছেন প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কৃষক। পানিতে ভেসে গেছে পাঁচ শতাধিক পুকুর-জলাশয়ের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এতে জেলার মৎসজীবীরা প্রায় ৫ কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাইবান্ধা মৎস্য বিভাগ। পাশাপাশি দুর্গত এলাকার অধিকাংশ কাঁচা বাড়িঘরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানির তোড়ে বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ পাকা-কাঁচা সড়ক ভেঙে ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় ভেলা ও নৌকায় যোগাযোগ করতে হচ্ছে বানভাসি মানুষের।
এদিকে, দফায় দফায় বন্যায় নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে তীব্র হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ঘাঘট নদীর ভাঙন। এরই মধ্যে সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়িসহ নদী গর্ভে বিলীন স্কুল, মন্দিরসহ নানা স্থাপনা। এছাড়া ঝুঁকির মধ্য রয়েছে শহর রক্ষা বাঁধসহ ঘাঘট, যমুনা ও করতোয়া নদীর তীরবর্তী অন্তত ২০টি বিভিন্ন পয়েন্ট। ফলে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে এসব এলাকার মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘রবিবার (২৬ জুলাই) সকাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়িঘাট পয়েন্টে অপরিবর্তীত থাকলেও বিপৎসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ঘাঘট নদের পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার কমে বর্তমানে ৭৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ২৪ ঘণ্টায় করতোয়ার পানিও গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪১ থেকে কমে ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।’
গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা একেএম ইদ্রিস আলী জানান, জেলার ৬টি উপজেলার ৩৬টি ইউনিয়ন ও গোবিন্দগঞ্জ পৌর এলাকার প্রায় দেড় লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। বন্যাকবলিত এলাকায় এ পর্যন্ত নগদ ৩০ লাখ টাকা এবং ৫৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিশু খাদ্যর জন্য নগদ ৪ লাখ টাকা, গো-খাদ্যর জন্য নগদ দুই লাখ এবং ৬ হাজার শুকনো খাবার প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে দুর্গত মানুষের জন্য। প্রতিদিনই বন্যার্ত মানুষের নতুন নতুন তালিকা আসছে। পর্যায়ক্রমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বানভাসি অসহায় সব মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হবে।








