১৯৬৫ সালে আট একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় নীলফামারী সরকারি ২০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্ঠ হাসপাতাল। জেলা সদরের পলাশবাড়ী ইউনিয়নের নটখানায় অবস্থিত হাসপাতালটিতে এক সময় দেশের উত্তরাঞ্চলের ৮ জেলার কুষ্ঠ রোগীরা চিকিৎসাসেবা নিতে আসতেন। বহির্বিভাগে থাকাতো হাজারো রোগীর ভিড়। কিন্তু জনবল ও চিকিৎসক সংকটে এখন গড়ে ৫০-৬০ জন রোগী হাসপাতালটির বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। আর ইনডোরে গড়ে ১২-১৩ জন রোগী ভর্তি থাকেন। এমন পরিস্থিতির জন্য চিকিৎসক ও জনবল সংকটকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।
একটি সূত্র জানায়, নীলফামারীতে একসময় এই রোগের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ায় সরকারিভাবে হাসপাতালটি স্থাপন করা হয়। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ঢাকা, সিলেট ও নীলফামারীতেই এর কার্যক্রম চালু আছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুষ্ঠ হাসপাতালে ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২০ জন। কিন্তু এই ২০ জনের মধ্যে ১২ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেষণে বদলি করা হয়। বর্তমানে ৮ জন দিয়ে হাসপাতালটি চলছে। এর মধ্যে আছেন (প্রেষণে) মেডিক্যাল অফিসার একজন, নার্স একজন, সহকারী নার্স একজন, এমএলএসএস দুই জন, আয়া একজন, মশালচি একজন ও ঝাড়ুদার একজন।
শূন্য পদগুলোর মধ্যে রয়েছে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (লেপ্রসি) একটি ও মেডিক্যাল অফিসার ৩টি। এছাড়া কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার একটি এবং মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) দুইটি পদই শূন্য। সিনিয়র স্টাফ নার্স (কর্মকর্তা) মঞ্জুরিকৃত পদ ১৫টির বিপরীতে কর্মরত ৮ জন; বাকি ৭ জনের পদ শূন্য। আবার ওই আট জনের মধ্যে কুষ্ঠ হাসপাতালে একজনকে রেখে বাকিরা ডেপুটেশনে নীলফামারী সদর আধুনিক হাসপাতালে যোগদান করেন।
এদিকে, সহকারী নার্স ৫ জনের বিপরীতে কর্মরত একজন। অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদটি শূন্য। এমএলএসএস (অফিস সহায়ক) ৬ জনের বিপরীতে কর্মরত দুই জন। বাকি ৪ জনকে অন্যত্র প্রেষণে বদলি করা হয়। আয়া ৩ জনের বিপরীতে কর্মরত দুই জন। এর মধ্যে একজনকে প্রেষণে সরিয়ে জেলার কিশোরগঞ্জ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কুক/মশালচি দুই জনের বিপরীতে কর্মরত একজন, বাকি একজনকে জেলার ডিমলা হাসপাতালে প্রেষণে বদলি করা হয়। ঝাড়ুদার (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) তিন জনের বিপরীতে কাজ করেন একজন। বাকি দুই জনকে অন্যত্র প্রেষণে বদলি করা হয়।
ওই হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী কবির হোসেন জানান, আগে তিন জন কাজ করেও সামাল দেওয়া যেত না। আর এখন তিন জনের কাজ একাই করতে হয়। বাকিদের বড় স্যারেরা বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়েছেন।
একই হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, হাসপাতালের রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা একেবারেই বন্ধ। ওই পদে জনবল না থাকায় ইনডোরের রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
হাসপাতালের রোগী শুকারু বর্মণ, বদির উদ্দিন ও আজাদ আলী বলেন, এখানে খাওয়া দাওয়ার কোনও সমস্যা নেই। তবে ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা কম থাকায় প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
সদরের পলাশবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মমতাজ আলী প্রামাণিক জানান, সরকারের দেওয়া খাবার, স্টেশনারি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও এমএসআর (যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ল্যাবরেটরি জিনিসপত্র) বাবদ পর্যাপ্ত বরাদ্দ আছে। শুধু জনবলের অভাবে রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আশা করি, জনবান্ধব এই সরকার কুষ্ঠ রোগীদের সুচিকিৎসার কথা বিবেচনা করে মঞ্জুরিকৃত পদসমূহ পূরণ ও প্রেষণকৃত কর্মচারীদের পুনঃবহাল করে হাসপাতাটি পুরোদমে সচল করবে।
হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা (মেডিক্যাল অফিসার) ডা. ভির্জিনিয়া শুক্লা বিশ্বাস বলেন, ‘আমি সবেমাত্র এই হাসপাতলে প্রেষণে যোগদান করেছি। তাই এসব বিষয় কিছুই জানি না।’
এ ব্যাপারে কুষ্ঠ হাসপাতালের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আউটডোর ও ইনডোরে রোগীর সংখ্যা কম থাকায় কয়েকজনকে সরিয়ে জেলার অন্যান্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়লে তাদের পুনরায় কর্মস্থলে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।’
সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর কবির মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমি সদ্য এই জেলায় যোগদান করেছি। জনবল সংকট থাকলে তা কর্তৃপক্ষের নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রোগীর বর্তমান পরিস্থির ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’





