‘আমি একজন এতিম ও অসহায় বিধবা নারী। আমার দুই সন্তানও এতিম। তাদের বাবার কেনা জমি ভূমিদস্যুরা অবৈধভাবে দখল করে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করছে। আমরা কিছুই করতে পারছি না। একবেলা ভালোভাবে খাবার জোটাতে পারি না, টাকা দিয়ে জমি রক্ষা করবো কীভাবে? টাকা না থাকায় তারা আমাদের সমঝোতার আশ্বাস দিয়েও সমঝোতা করেনি। এক বছর ধরে জমিতে যেতে পারি না। জমিতে গেলে আমাকে ও আমার বোনকে মারধর করে। আমার জমি রক্ষায় বা সমাধানে কাফনের কাপড় পরে অনশন করবো। এতে আমার মৃত্যু হলেও আমাকে এটা করতে হবে। আমার এতিম সন্তানরা তো বলতে পারবে, জমির জন্য বাবা গেছে, মায়েরও মৃত্যু হয়েছে। শুরু করবো। জমি ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত মরণ হলেও সেখান থেকে উঠবো না।’
শুক্রবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে পঞ্চগড় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন সৈয়দা আনোয়ারা বেগম নামে এক নারী। সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সময় বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আদালতে গিয়ে ওই জমিতে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করলে আদালত নিষেধাজ্ঞা আদেশ দেন। আদেশের পরে কিছু দিন তারা চুপচাপ থাকে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আবারও তারা মাটি ভরাট শুরু করে। এ সময় বাধা দিতে গেলে ভূমিদস্যু ও তাদের সন্ত্রাসীরা আমার ছোট বোন মরিয়ম ইয়াসমিন সেলিসহ তার সঙ্গে থাকা লোকজনদের মারধর করে। এক পর্যায়ে ৯৯৯ কল করলে পুলিশ এসে উদ্ধার করে। পরদিন পঞ্চগড় সদর থানায় মামলা করি। স্বামীর মৃত্যুর পর বাবার বাড়িতে থাকায় ভূমিদস্যুরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। এমনকি ওই জমির ওপরেই নর্থ পয়েন্ট মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শেষ করে। আগামী শনিবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।’
লিখিত বক্তব্যে ওই নারী বলেন, ‘পঞ্চগড় সদর উপজেলার দারিয়াপাড়া এলাকায় আমার প্রয়াত স্বামীর কেনা এক একর ২০ শতক জমি তারা ভোগদখল করে আসছিলাম। এর মধ্যে ৫০ শতক জমি এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে বিক্রি করি। বাকি ৭০ শতক জমি ওই এলাকার আলম হোসেন নামে এক চাষিকে বর্গা দিয়েছিলাম। ২০২২ সালের ১২ জুন জাহাঙ্গীর আলম রানা নামের এক ব্যক্তি নর্থ পয়েন্ট মেডিক্যাল কলেজের পরিচালক পরিচয় দিয়ে তার বাহিনী দিয়ে তাদের জমিটি দখল করে টিনের বেড়া দিয়ে মাটি ভরাট করতে থাকে। এ সময় বাধা দিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়।’
তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী মোশারফ হোসেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের দাড়িয়াপাড়া গ্রামের নিজামাবাদ মৌজায় পাঁচ দাগে এক একর ২০ শতক জমি কিনেছিলেন। স্ত্রী ও দুই নাবালক ছেলে সন্তান রেখে ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। স্বামী মারা যাওয়ার পর পঞ্চগড় জজ আদালতে দুই নাবালক সন্তানের পক্ষে জমি বিক্রির আদেশ নিয়ে এক ব্যক্তির কাছে ৫০ শতক জমি বিক্রি করি। বর্তমানে ওই জমির চারপাশে সীমানা প্রাচীর দিয়ে রেখেছি। বাকি ৭০ শতক জমি দাড়িয়াপাড়া গ্রামের আলম হোসেনকে বর্গা দিয়েছি। বর্তমানে সব মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় জানতে পারি, শনিবার নর্থ পয়েন্ট মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল লিমিটেডের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। এতিম দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষায় জাহাঙ্গীর আলম রানার কাছ থেকে জমি উদ্ধার করা দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। তা না হলে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় মেডিক্যাল কলেজের সামনে কাফনের কাপড় পড়ে অনশন করবো।
ওই নারীর ছোট বোন মরিয়ম ইয়াসমিন সেলি বলেন, ‘তারা অন্যায়ভাবে আমার বোনের জমি দখল করে আছে। তারা যদি ন্যায্যমূল্যে জমি কিনতে চায় আমরা বিক্রি করতেও রাজি আছি। কিন্তু তারা জমি কিনেও নিচ্ছে না দখলও ছাড়ছে না। এর মধ্যেই তারা মেডিক্যাল কলেজের কাজ শুরু করছে। আমরা চাই, অন্তত এই এতিম পরিবারটি যেন ন্যায়বিচার পায়।’
এ বিষয়ে নর্থ পয়েন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম রানা বলেন, ‘আমাদের মেডিক্যাল কলেজটি ৩২ একর জমির মধ্যে হচ্ছে। আমরা কারও জমি দখল করিনি। আমাদের কেনা জমির মধ্যে একটি দাগে ২/১ শতক জমি কেউ দাবি করতে পারে। তারপরও তারা আদালতে মামলা করেছে। এ বিষয়ে আদালত রায় দেবেন। আর জমিতে নিষেধাজ্ঞার কোনও কাগজ আমরা পাইনি। এখানে ওই নারীর কোনও জমি নেই।’









