ট্রেডিং করপোরেশন বাংলাদেশ (টিসিবি) এর মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রমে চেয়ারম্যান-মেম্বারের বিরুদ্ধে হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। নীলফামারীর সৈয়দপুরে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে কার্ড কেড়ে নিয়ে গোপনে অন্যের কাছে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগ থেকে বাদ পড়েনি ডিলার এবং সরকারি ট্যাগ অফিসারও। ফলে প্রকৃত কার্ডধারী হয়েও টিসিবির পণ্য পায়নি অনেকে। অথচ কার্ডধারী না হয়েও অনেকে একাধিক কার্ডের মাল তুলে খাচ্ছে।
রবিবার সকালে উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে কার্ডধারী হয়েও পণ্য থেকে বঞ্চিত শতাধিক দরিদ্র অসহায় মানুষ বিক্ষোভ করেছে। এ সময় অভিযোগকারীরা জানায়, চার মাস আগে মাল নেওয়ার সময় তাদের কার্ড ডিজিটাল করার কথা বলে জমা নেয় স্থানীয় ডিলার। কিন্তু তাদের কার্ড আর ফেরত দেওয়া হয়নি। মাঝে একবার মাল দিয়েছে এবং আজ আবার দিচ্ছে। কার্ড না পাওয়ায় হাতে টাকা থাকলেও মাল নিতে পারছেন না। অথচ ডিলার বলছে গতবার সব কার্ডের মাল দেওয়া হয়েছে। এবারও দেওয়া হবে। তাহলে আমাদের কার্ড কোথায়? আমরা এই অনিয়ম ও হয়রানির বিচার চাই।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডিলারের লোকজন তালিকার সঙ্গে কার্ড মিলিয়ে দেখছে না। যিনি কার্ড নিয়ে এসেছেন তিনি প্রকৃত কার্ডধারী কি না তাও যাচাই করছেন না। ফলে একই ব্যক্তি একাধিক কার্ডের মাল তুলছে।
এ সময় মাল বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাফা স্টোরের ম্যানেজার সাবু বলেন, ‘কার্ডধারী নিজের কার্ড দিয়ে মাল নিচ্ছে, না অন্যেরটা দিয়ে নিচ্ছে, তা দেখা আমাদের দায়িত্ব না। ওটা দেখবে ট্যাগ অফিসার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যার হাতে কার্ড পাবো তাকেই মাল দেবো। আমরা কার্ড জমা নিয়ে চেয়ারম্যানকে বুঝিয়ে দিই। তিনি যাচাই-বাছাই করে সুবিধাভোগীদের মাঝে আবার বিতরণ করেন। তাতে কেউ কার্ড না পেয়ে থাকলে আমাদের কিছুই করার নাই। আমরা বরাদ্দকৃত ৪ হাজার ২২০টি কার্ডের বিপরীতে ২ লিটার করে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল বিতরণ করেছি। কেউ কার্ড অনুযায়ী মাল না পেয়ে থাকলে দায় আমাদের।’
ওই দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কর্মকর্তা আবু জাফর উপস্থিত ছিলেন না। মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ না করায় তার মতামত জানা সম্ভব হয়নি।
ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের সোনাখুলী মুন্সিপাড়ার মহুবার হোসেন, মোজাহারুল, আজিজুল, রবিউল, বকপাড়ার মুসলিম বলেন, ‘চার মাস আগে কার্ড জমা নিলেও ফেরত দেওয়া হয়নি। তাই দুই বার মাল দেওয়া হলেও আমরা নিতে পারিনি। একইভাবে ১ নং ওয়ার্ডের হাজীপাড়ার শেখ মমতাজের স্ত্রী রুবিনা, ৮ নং ওয়ার্ডের সমসের, আরমানও কার্ড এবং মাল না পাওয়ার অভিযোগ করেন।
তারা সবাই বলেন, কার্ড ওলটপালট করা হয়েছে। পাড়ায় পাড়ায় ১০ থেকে ১৫ জনের কার্ড ৪ মাস থেকে আটকে রেখে মাল গোপনে বিক্রি করা হয়েছে। চেয়ারম্যান-মেম্বার কার্ড বিক্রি করে খেয়েছে। আমরা বঞ্চিত হয়েছি। এখন বলছে নতুন করে কার্ড বানিয়ে দেবে। কিন্তু গত দুইবারের মাল কে বা কারা খেলো তাদের কোনও বিচার নাই। এই দুর্নীতির সঙ্গে সবাই জড়িত। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
৯ নং ওয়ার্ডের মেম্বার হারুন বলেন, ‘ডিলার কার্ড জমা নিয়ে চেয়ারম্যানকে দিয়েছে। চেয়ারম্যান আমাদেরকে যে কার্ড দিয়েছে তা আমরা বিলি করেছি। এতে কেউ না পেয়ে থাকলে তা আমার দেখার বিষয় নয়। কার্ড কোথায়, কে মাল তুলেছে তাও জানি না। তা নিয়ে আমার মাথাব্যথাও নাই। চেয়ারম্যান জানেন কী করবেন।’
উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান জুন বলেন, ‘এত কার্ড নাম ধরে ধরে বিতরণ সম্ভব নয়। তাছাড়া কার্ডের নাম, নম্বর বা ঠিকানা ঠিকভাবে নাই। তাই বিতরণে একটু হেরফের হয়েছে। দুই মাস হয়তো একজনের কার্ড অন্যজন পেয়ে মাল তুলে নিয়েছে। আবার কেউ কেউ কার্ড পেয়েও অস্বীকার করে মেম্বারদের চাপ দিয়ে একাধিক কার্ড নিয়ে তসরুফ করেছে। তবে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করে যার যার কার্ড তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’
অভিযোগে জানা যায়, চেয়ারম্যান-মেম্বাররা কৌশল করে ডিলারের মাধ্যমে কার্ড জমা নিয়ে নিজেদের লোকজনকে দিয়ে মাল তুলে নিয়ে বিক্রি করেছে। এভাবে প্রায় ২ হাজার কার্ডধারী থেকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে ডিলার এবং ট্যাগ অফিসারও জড়িত।









